দূরপাল্লার যাত্রায় হাইওয়ে দিয়ে চলার সময় রাস্তার পাশে বড় বড় সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। কোথায় কোন শহর কত কিলোমিটার দূরে, কোন পথে গেলে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে-এসব তথ্য জানাতেই ব্যবহার করা হয় এসব দিকনির্দেশক বোর্ড।
তবে খেয়াল করলে দেখা যায়, বিশ্বের অনেক দেশের হাইওয়েতে দিকনির্দেশক সাইনবোর্ডের পটভূমি সবুজ এবং তাতে লেখা থাকে সাদা অক্ষরে। এটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে মানুষের দৃষ্টিশক্তি, মনোবিজ্ঞান, দ্রুত তথ্য বোঝার সক্ষমতা এবং সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ।
দূর থেকেই সহজে চোখে পড়ে
হাইওয়েতে গাড়ি সাধারণত তুলনামূলক বেশি গতিতে চলাচল করে। ফলে চালকের সামনে কোনো সাইনবোর্ড আসার পর সেটি পড়া এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সময় থাকে খুবই কম।
এই কারণে সাইনবোর্ড এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে দূর থেকেই চালকের চোখে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝে নেওয়া যায়। সবুজ পটভূমির ওপর সাদা লেখা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
সাদা লেখারও রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব
সাইনবোর্ডে শুধু সবুজ রং ব্যবহার করাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর ওপর সাদা অক্ষর ব্যবহারেরও নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। সবুজ পটভূমির সঙ্গে সাদা লেখার ভালো কনট্রাস্ট তৈরি হয়। ফলে চলন্ত গাড়ি থেকেও অল্প সময়ের মধ্যে লেখা পড়া সহজ হয়।
সড়কের বিভিন্ন ধরনের তথ্য বোঝাতেও ভিন্ন ভিন্ন রং ব্যবহার করা হয়। সতর্কতা বা বিপদের সংকেতের ক্ষেত্রে অনেক সময় হলুদ, লাল কিংবা কমলা রং দেখা যায়। অর্থাৎ রঙের ব্যবহারের মাধ্যমেও চালককে কোনো তথ্যের ধরন দ্রুত বুঝতে সহায়তা করা হয়।
চোখের জন্য তুলনামূলক আরামদায়ক
দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে চোখে ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবুজ রং মানুষের চোখের জন্য তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক। প্রকৃতির সঙ্গে এই রঙের সম্পর্ক থাকায় এটি চোখে কম চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘ সময় দেখলেও তুলনামূলক কম অস্বস্তি তৈরি করে।
অন্যদিকে লাল বা উজ্জ্বল হলুদের মতো রং সাধারণত সতর্কবার্তার জন্য ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘ সময় এসব রং দেখলে চোখে চাপ বাড়তে পারে। তাই পথনির্দেশের মতো তথ্যের জন্য সবুজ রংকে উপযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রাতেও সহজে দেখা যায়
হাইওয়ের সাইনবোর্ড শুধু দিনের জন্য নয়, রাতের চলাচলের কথাও মাথায় রেখে তৈরি করা হয়। অধিকাংশ বোর্ডে প্রতিফলক বা রিফ্লেকটিভ উপাদান ব্যবহার করা হয়।
ফলে গাড়ির হেডলাইটের আলো সাইনবোর্ডে পড়লে সাদা লেখাগুলো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অন্ধকারের মধ্যেও চালক প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা সহজে দেখতে ও বুঝতে পারেন।
বিশ্বের অনেক দেশেই একই ধরনের ব্যবস্থা
একেক দেশ বা অঞ্চলে হাইওয়ের দিকনির্দেশক সাইনবোর্ডের রং ও ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন হলে নতুন জায়গায় গাড়ি চালানোর সময় চালকদের বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এ কারণে বিশ্বের অনেক দেশেই নির্দিষ্ট মান অনুসরণ করে দিকনির্দেশক বোর্ড তৈরি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের অনেক দেশে হাইওয়ের দিকনির্দেশক সাইনবোর্ডে সবুজ পটভূমি ও সাদা লেখা দেখা যায়। এতে অপরিচিত এলাকাতেও চালকদের পথ চিনতে সুবিধা হয়।
দূরপাল্লার চালকদের জন্যও কার্যকর
হাইওয়েতে দিন-রাত অসংখ্য বাস, ট্রাক ও পণ্যবাহী যান চলাচল করে। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর কারণে চালকদের অনেকেই শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
এমন পরিস্থিতিতে পরিচিত সবুজ সাইনবোর্ড দ্রুত তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সার্ভিস এরিয়া কিংবা গন্তব্যস্থল চোখ এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে। এতে যাত্রাপথ আরও নিরাপদ হয়।
শুধু সৌন্দর্য নয়, নিরাপত্তারও অংশ
অনেকের ধারণা, সাইনবোর্ডে সবুজ রং ব্যবহারের মূল কারণ এটি দেখতে সুন্দর। বাস্তবে এর পেছনের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষের দৃষ্টিশক্তি, মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, দ্রুত তথ্য শনাক্ত ও বোঝার সুবিধা এবং সড়ক নিরাপত্তার বিভিন্ন মানদণ্ড বিবেচনা করেই হাইওয়ের দিকনির্দেশক বোর্ডে এমন রঙের ব্যবহার করা হয়।
তাই পরেরবার হাইওয়ে দিয়ে কোথাও যাওয়ার সময় রাস্তার পাশে সবুজ সাইনবোর্ড চোখে পড়লে মনে রাখতে পারেন-এটি শুধু পথ দেখানোর একটি মাধ্যম নয়, বরং নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জ/উ