বিএনপি বিরুদ্ধে দলের ভেতর ও বাইরে থেকে ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। আজ শনিবার বিকালে রাজধানীতে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনি এ কথা জানান।
ফার্মগেটের বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এই আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমান।
অনুষ্ঠানে মির্জা আব্বাস বলেন, এর মধ্যে অনেক কিছু হবে, হচ্ছে। সব কিছু আপনার কানে যায় না। আমাদের কাছে যা আসে, যেগুলো আসে ইনশাআল্লাহ আপনাকে জানাব। এই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দলের ভিতর থেকে হচ্ছে, দলের বাইরে থেকে হচ্ছে। এটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। আপনারা যারা আছেন আমার ভাইয়েরা, আমি মনে করি সকলেই মোটামুটি দেশপ্রেমিক এবং দলপ্রেমিক।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে মির্জা আব্বাস বলেন, যেগুলো আপনারা জানবেন তা কথায় এবং কাজে নেতাকে জানিয়ে দিবেন। কারণ কোনো কিছু গোপন থাকলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না। আর হাত দিয়ে রাতের অন্ধকার কিংবা দিনের আলো ঢেকে রাখা যায় না। এটা প্রকাশ হবেই। আপনারা সবাই আমার সহকর্মী, আপনারা নেতাকে ফাঁকি দেওয়া মানে দেশকে ফাঁকি দেওয়া, এটা মনে রাখবেন।
কিছু নেতাকর্মীর আচরণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি জানান, আমার অনেক নেতাকর্মী আছেন, কিছু মনে করবেন না, আমি খোলাখুলি বলি। কিছু নেতা-কর্মীর কারণে বদনাম হচ্ছে। আপনাদের বয়সটা আমাদের ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছি, রাজনীতি শিখেছি। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে থেকে রাজনীতি করেছি। কিন্তু আমাদের সময়ের দুই-একজন হাতেগোনা লোক ছাড়া এই দলের কোনো বদনাম আমাদের কারণে হয়নি।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আপনারা যারা উপস্থিত আছেন, তারা অন্তত সীমিত সংখ্যক। যদি আপনারা সঠিক নেতৃত্ব দেন এবং সঠিক বিষয়গুলো নেতার কাছে তুলে ধরেন, তাহলে নিশ্চয়ই দল আরও টিকে থাকবে। আজকে ৪৮ বছর হয়েছে। ভেবে দেখেন একটা দলের ৪৮ বছর হয়েছে। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা, যাকে হত্যা করা হয়েছে, এই দলের ওপর অত্যাচার কম হয়নি। বেগম খালেদা জিয়া জেল খেটেছেন। আমরা জেল খেটেছি। দল এখনো ঠিক আছে।
দল রক্ষা ও ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ দল মরে যাওয়ার জন্য আসে নাই, ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য আসে নাই। দুই-একজন লোকের জন্য দলটার বদনাম হতে পারে না। এটা একটু আপনারা খেয়াল রাখবেন। আশা করি, আমার কথা নেতা বুঝেছেন। আপনারাও ভালো করে বুঝেছেন। দয়া করে যাই করেন না কেন, দলটাকে বাঁচিয়ে রাখবেন। এই দলই দেশ বাঁচিয়ে রাখবে
এ সময় আবেগআপ্লুত কণ্ঠে ক্ষমা চেয়ে তিনি জানান, আপনাদের সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং ধন্যবাদ। আমার বক্তব্যে কেউ মর্মাহত হলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। দলটাকে আমি অনেক ভালোবাসি।
সাড়ে পাঁচ মাস বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত বুধবার দেশে ফিরে শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও হুইলচেয়ারে করে আলোচনা সভায় যোগ দেন মির্জা আব্বাস। তিনি মঞ্চে উঠে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে বসেন।
জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, বিএনপি তো শুধু একটি দলের নাম নয়, বিএনপি মানে স্বাধীনতার চেতনা, বিএনপি মানে গণতন্ত্র, বিএনপি মানে মানুষের অধিকার। আমরা একই আদর্শে অটল। অনেক ঝড় এসেছে, আমরা ভেঙ্গে পড়িনি, নির্যাতন এসেছে, আমরা মাথা নত করিনি। কারণ আমরা শহীদ জিয়ার সৈনিক। আজকের দিনে আমাদের শপথ দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত আমরা রাজপথে ছিলাম, থাকব। জনগণের পাশে থাকব। আসুন ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে নিতে, শক্তিশালী করতে, মানুষের বাংলাদেশ গড়তে আমরা আমাদের নেতা তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করি।
নিজের চিকিৎসা ও নেতার সহযোগিতার কথা স্মরণ করে তিনি তুলে ধরেন, আমি পরিপূর্ণভাবে সুস্থতা লাভ করিনি। এর মধ্যে আমি দেশের মানুষের অকুন্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি, ভালোবাসা পেয়েছি আমাদের নেতা তারেক রহমানের। তিনি নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন। খুব ভালো লেগেছে। যদিও আমার কিছু করার ছিল না, শুধু শুনেছি। তখন ফোন করার মতো অবস্থা ছিল না আমার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সতর্ক করে দলের এই প্রবীণ নেতা বলেন, আজকে একটি কথা আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই। অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে এই দলের বিরুদ্ধে। অনেক ষড়যন্ত্র হবে। ষড়যন্ত্র হবে মাননীয় নেতা আপনার বিরুদ্ধে। আপনি দয়া করে সাবধানে থাকবেন।
তিনি যোগ করেন, বহু কর্মী আছে, নেতা আছে যারা আপনার সামনে অনেক ভালো ভালো কথা বলে কিন্তু বাইরে ভালো কথা বলে না। আপনি কখনো আমাকে একাকীত্বে জিজ্ঞেস করেন, আমি আপনাকে সেগুলো বলব। বিষয়গুলো সম্পর্কে আপনার সাবধান হওয়া উচিত। কারণ, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের এত স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। বেগম খালেদা জিয়ার স্নেহে আমি লালিত হয়েছি। তার সঙ্গে বহু কাজ করেছি। নিঃসন্দেহে কেউ তাকে হত্যা করেনি। কিন্তু তিনি যেভাবে মারা গেছেন, তা আমাদের কাম্য ছিল না।
তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মির্জা আব্বাস দাবি করেন, আপনার সব ভালো ভালো কাজ কিছু খারাপ লোকের খারাপ কথায়, খারাপ কাজে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দয়া করে আপনি খেয়াল রাখবেন। আজকের এই মিটিংয়ে এসেছি বিবেকের তাড়নায়। ৪৮ বছরে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া, অসুস্থতা ছাড়া, আমার কখনো এই দিনটি পালন করা বাদ দেইনি। বিএনপির অনেক কাজ হয়তো বাদ গেছে, কিন্তু এই দিনটি পালন করা কখনো বাদ দিইনি, ভবিষ্যতেও দেব না।
রাজনীতির শেষ ইচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে রাজনীতিতে এসেছিলাম, খালেদা জিয়ার স্নেহ পেয়েছি। আপনার সঙ্গে রাজনীতি করে আমার রাজনৈতিক জীবন শেষ করতে চাই। বিএনপিতেই আমার রাজনীতি ইনশাআল্লাহ শেষ হবে।