নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য এখন অনলাইনে টাকার বিনিময়ে প্রকাশ্যেই কেনাবেচা হচ্ছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য, মোবাইলের অবস্থান, কল রেকর্ড, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, কর শনাক্তকরণ নম্বর থেকে শুরু করে মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব সবই পাওয়া যাচ্ছে নির্দিষ্ট দামে। কারও এনআইডি পেতে লাগছে মাত্র ১৭ মিনিট, মোবাইলের অবস্থান পেতে ১৬ মিনিট এবং তিন মাসের কল রেকর্ড পেতে কয়েক ঘণ্টা।
গত ১৫ জুন থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত একটি শব্দ ব্যবহার করে ফেসবুকে ৬৭৫টি পোস্ট খুঁজে পায় তারা। এর মধ্যে ৬০৫টি পোস্টে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন ছিল। এসব পোস্টের সূত্র ধরে ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে বিভিন্ন তথ্যের নির্দিষ্ট মূল্যতালিকাও রয়েছে।
অনুসন্ধানে তিন বিক্রেতার কাছ থেকে টাকা দিয়ে এনআইডি, অবস্থান ও কল রেকর্ড কেনে ডিসমিসল্যাব। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে বিক্রি করা তথ্য সঠিক পাওয়া যায়। এমনকি একজনের এনআইডিতে দুই মাস আগে সংশোধন করা মায়ের নামও হালনাগাদ অবস্থায় পাওয়া গেছে।
একজন ব্যক্তির সম্মতি নিয়ে তার মোবাইল নম্বর ও ৫০০ টাকা অগ্রিম দেওয়ার পর মাত্র ১৭ মিনিটে এনআইডির কপি পায় ডিসমিসল্যাব। অন্য একটি পরীক্ষায় ১৫০ টাকা দিয়ে ভোটার নম্বর ও জন্মতারিখ দেওয়ার পর পাওয়া যায় এনআইডির ‘সার্ভার কপি’।
আর একটি নম্বরের তিন মাসের কল রেকর্ডের জন্য ১ হাজার ৫০ টাকা দেওয়ার আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ফাইল পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২০টি নম্বর, কলের সময় ও কলের ধরন প্রকৃত কল তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে সবই মিলে যায়।
আরেক বিক্রেতার ওয়েবসাইটে ১ হাজার ৫০০ টাকায় মোবাইলের সর্বশেষ অবস্থান, সংশ্লিষ্ট টাওয়ার, ঠিকানা ও মানচিত্রের অবস্থান দেওয়ার কথা ছিল। টাকা দেওয়ার ১৬ মিনিটের মধ্যে সেই তথ্যও সরবরাহ করা হয়।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে পাওয়া ওয়েবসাইটগুলোর মূল্যতালিকায় ৫০ থেকে ২০০ টাকায় এনআইডির ‘সার্ভার কপি’, ২৫০ টাকায় মোবাইল নম্বর থেকে এনআইডি, ৯০০ টাকায় তিন মাসের কল তালিকা, ১ হাজার ৮০০ টাকায় ছয় মাসের কল তালিকা এবং ১ হাজার ৫০০ টাকায় ‘লাইভ লোকেশন’ দেওয়ার কথা রয়েছে। ৭ হাজার টাকায় নগদের হিসাব এবং ৭ হাজার ৫০০ টাকায় বিকাশ-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার তালিকাও পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্টের প্রথম পৃষ্ঠা, টিআইএন, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ, এসএমএসের তালিকা ও মোবাইল ফোনের পরিচিতি নম্বরের তথ্যও বিক্রির তালিকায় রয়েছে।
এই বাজারের কার্যক্রমও বেশ সংগঠিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রেতা সংগ্রহ করা হয়। পরে মধ্যস্বত্বভোগীরা বিক্রেতা ওয়েবসাইটে টাকা জমা দিয়ে তথ্যের অর্ডার করেন। বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায়ের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ফেসবুকে বেশি দামে তথ্য বিক্রি করা হয়।
এক মাসের অনুসন্ধানেই অন্তত ১১২টি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে তথ্য বিক্রির প্রচারণা পাওয়া গেছে। একটি গ্রামীণফোন নম্বর ৭৫টি পোস্টে ব্যবহার করা হয়েছে। ৩৬টি সক্রিয় ফেসবুক গ্রুপে বারবার ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়।
অনুসন্ধানে একটি ওয়েবসাইটের মালিকের পরিচয়ও পাওয়া যায়। তিনি মুঠোফোন মেরামতের কাজ করেন। তার দাবি, তিনি অন্য একটি গোষ্ঠীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে সরকারি সার্ভারে ঢোকার পদ্ধতি বা এ দাবির কারিগরি সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবিরের মতে, কোনো ব্যক্তির হালনাগাদ তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভেতরের কারও সম্পৃক্ততা অথবা তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তার কোনো দুর্বলতা কাজে লাগানোর আশঙ্কা থাকে।
ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির ঘটনা নতুন নয়। গত তিন-চার বছর ধরে ফেসবুক, টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপে এনআইডি ও ফোনের তথ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৪ সালে সরকারি পর্যায়ের অনুসন্ধানেও নাগরিকের এনআইডি ও কল রেকর্ড ২১টি হোয়াটসঅ্যাপ, ৪৮টি টেলিগ্রাম এবং ৭২০টি ফেসবুক গ্রুপ ও পেজে বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়। মোট ৭৮৯টি গ্রুপ ও পেজে এ ধরনের তথ্য কেনাবেচার সন্ধান মিলেছিল। কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহৃত লগইন তথ্যের অপব্যবহারের বিষয়ও সামনে আসে।
এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং ২০২৬ সালে এসে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে শত শত বিজ্ঞাপন ও সক্রিয় ওয়েবসাইটের সন্ধান মিলেছে।
ব্যক্তিগত তথ্যের ঝুঁকি শুধু অনলাইনে তথ্য বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছরে সরকারি ডেটাবেজ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তা নিয়েও একের পর এক ঘটনা সামনে এসেছে।
২০২৩ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের একটি সরকারি ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে প্রায় ৫ কোটি নাগরিকের নাম, জন্মতারিখ, এনআইডি, ফোন নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য অনলাইনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। ঘটনাটি সরাসরি হ্যাকিং নয়; কারিগরি দুর্বলতার সুযোগে তথ্য উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল।
২০২৪ সালেও সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক হামলা ও তথ্য নিরাপত্তার ঘটনা ঘটে। নভেম্বরে তিতাস গ্যাসের ফায়ারওয়ালের ‘রুট অ্যাকসেস’ ডার্ক ওয়েবে বিক্রির জন্য তোলার ঘটনা সামনে আসে। একই সময়ে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সে র্যানসমওয়্যার হামলায় বিপুল পরিমাণ তথ্য চুরির দাবিও ওঠে।
আর্থিক খাতও বাদ যায়নি। সিটি ব্যাংকের গ্রাহকদের কিছু আর্থিক বিবরণী অননুমোদিতভাবে দেখা ও পরে তা বিক্রির চেষ্টার ঘটনা সামনে আসে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি সিস্টেম ত্রুটির সুযোগ নিয়ে সীমিতসংখ্যক বিবরণীতে প্রবেশ করা হয়েছিল।
২০২৫ সালে ব্যাংকিং খাতসহ দেশের সাইবার অবকাঠামোতে ধারাবাহিক হামলার সতর্কতা জারি হয়। সরকারি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডারেও অনুপ্রবেশ ও তথ্য চুরির ঘটনা সামনে আসে। ২০২৬ সালেও সরকারি ও প্রতিরক্ষা খাত লক্ষ্য করে সাইবার হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এর মধ্যেই অনলাইনে ৬০ লাখ বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীর জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। হ্যাকার গোষ্ঠীটির দাবি, এসব সিভি একটি চাকরির ওয়েবসাইটের তথ্যভাণ্ডার থেকে নেওয়া। সিভিগুলোতে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ই-মেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের তথ্য থাকার কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ১৪৮টি সিভির নমুনাও প্রকাশ করা হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগ সিভি পুরোনো; অনেকগুলো ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে হালনাগাদ করা। নমুনায় থাকা কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা আগে সংশ্লিষ্ট চাকরির ওয়েবসাইটে সিভি আপলোড করেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি তথ্য ফাঁসের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে পাওয়া চিত্র বলছে, ব্যক্তিগত তথ্যের কেনাবেচা এখন আর বিচ্ছিন্ন কয়েকজনের কাজ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ওয়েবসাইট, মধ্যস্বত্বভোগী, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহের একটি কাঠামো।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আইন ও নীতিমালায় ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে নাগরিকের তথ্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কার তথ্য কোথা থেকে বের হচ্ছে, কারা তা সংগ্রহ করছে, কারা বিক্রি করছে এবং তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা ভেঙে পড়লে দায় নিচ্ছে কে এখন এসব প্রশ্নের জবাবদিহিই সবচেয়ে জরুরি।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা সমকালকে বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য আলাদাভাবে ফাঁস হলেও একাধিক উৎসের তথ্য এক জায়গায় চলে এলে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। নাম, এনআইডি, ফোন নম্বর, ঠিকানা, অবস্থান ও পেশাগত তথ্য মিলিয়ে একজন ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচয় তৈরি করা সম্ভব। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি ও লক্ষ্যভিত্তিক ফিশিংসহ নানা ধরনের অপরাধ করা সহজ হয়। এনআইডির তথ্য ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়।
কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় অপরাধীদের বিচার হয়েছে এমন নজির খুব কম। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বারবার সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই নাজুক। তাই তথ্য ফাঁসের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি কোন উৎস থেকে তথ্য বের হচ্ছে এবং কীভাবে তা বাইরে যাচ্ছে, সেটি শনাক্ত করে পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
জ/রা