কেউ ছুটেছেন শিরোপার জন্য, কেউ নিজের সীমা অতিক্রম করতে। আবার কেমোথেরাপি চলাকালেও একজন নেমেছিলেন জীবনকে হার না মানার বার্তা দিতে। ৪০ হাজারের বেশি মানুষের পদচারণায় রোববারের সিডনি ম্যারাথন তাই শুধু দৌড়ের প্রতিযোগিতা ছিল না, একই সকালে এখানে লেখা হয়েছে গতি, সাহস ও মানবিকতার কয়েকটি অসাধারণ গল্প।
রোববার (৩০ আগস্ট) সিডনি সময় সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে নর্থ সিডনি থেকে মূল হাই-পারফরম্যান্স দৌড় শুরু হয়। হারবার ব্রিজসহ শহরের পরিচিত বিভিন্ন পথ ঘুরে ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দৌড় শেষ হয় সিডনি অপেরা হাউসের সামনে। ১৪০টির বেশি দেশের প্রতিযোগীর অংশগ্রহণে এটি ছিল সিডনি ম্যারাথনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আয়োজন। দিনের সবচেয়ে আলোচিত সাফল্যটি এসেছে ইথিওপিয়ার ২১ বছর বয়সী আদ্দিসু গোবনার কাছ থেকে। গতবার দ্বিতীয় হয়ে ফিরতে হয়েছিল তাকে। এবার সেই আক্ষেপ মুছে দিয়েছেন নতুন কোর্স রেকর্ড গড়ে।
দৌড়ের শেষ ভাগেও পাঁচজনের অগ্রবর্তী দল কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। সেখান থেকে সময়মতো গতি বাড়িয়ে গোবনা অপেরা হাউসের সামনে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করেন ২ ঘণ্টা ৪ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে। এর মধ্য দিয়ে তিনি গত বছর ইথিওপিয়ার হাইলেমারিয়াম কিরোসের গড়া ২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৬ সেকেন্ডের কোর্স রেকর্ড ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ব্যবধানে ভেঙে দেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো পুরুষ অ্যাথলেটের এটিই দ্রুততম ম্যারাথন।
গোবনার খুব কাছেই ছিলেন ইথিওপিয়ার চিমদেসা দেবেলে গুদেতা। তিনি ২ ঘণ্টা ৪ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে দ্বিতীয় হন। লেসোথোর তেবেলো রামাকোঙ্গোয়ানা ২ ঘণ্টা ৪ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। প্রথম তিনজনই আগের কোর্স রেকর্ডের চেয়ে কম সময়ে দৌড় শেষ করেছেন।
জয়ের পর গোবনা জানান, গতবারের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে নতুনভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন তিনি। এক বছরের সেই পরিশ্রম এবার তাকে শিরোপার পাশাপাশি রেকর্ডও এনে দিয়েছে। নারীদের বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বীদের খুব বেশি সুযোগ দেননি কেনিয়ার পেরেস জেপচিরচির। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও সাবেক অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এই দৌড়বিদ ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করেন। দ্বিতীয় হওয়া কেনিয়ার ইরিন চেপতাইয়ের চেয়ে তিনি ৩ মিনিট ৪০ সেকেন্ড এগিয়ে ছিলেন।
চেপতাই সময় নেন ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট ১১ সেকেন্ড। ইথিওপিয়ার শুর ডিমাইজ ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে তৃতীয় হন। জেপচিরচির শিরোপা জিতলেও সিফান হাসানের গত বছর গড়া ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ২২ সেকেন্ডের কোর্স রেকর্ডটি মাত্র ৯ সেকেন্ডের জন্য অক্ষত থেকে যায়। এটি জেপচিরচিরের চতুর্থ ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরস শিরোপা।
মূল দৌড়বিদদের আগে অপেরা হাউসের ফিনিশিং লাইনে পৌঁছান হুইলচেয়ার অ্যাথলেটরা। পুরুষ বিভাগে যুক্তরাষ্ট্রের ড্যানিয়েল রোমানচুক ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে নতুন কোর্স রেকর্ড গড়েন। তিনি গত বছর মার্সেল হাগের করা ১ ঘণ্টা ২৭ মিনিট ১৫ সেকেন্ডের রেকর্ড ভেঙে দেন।
নারীদের হুইলচেয়ার বিভাগে সুইজারল্যান্ডের ম্যানুয়েলা শার সময় নেন ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ৪ সেকেন্ড। এতে সুজান্না স্কারোনির আগের রেকর্ড থেকে ২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড কমিয়ে দেন তিনি। তবে শারের অর্জন শুধু সময়ের রেকর্ডেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরসের আটটি কোর্সে জয় পাওয়া প্রথম অ্যাথলেট হওয়ার অনন্য কীর্তিও গড়েছেন এই প্যারালিম্পিয়ান।
বিদেশি তারকাদের আধিপত্যের মধ্যেও স্বাগতিকদের জন্য আনন্দ এনে দেন অ্যান্ডি বুকানন ও এলি প্যাশলি। অস্ট্রেলিয়ান পুরুষদের মধ্যে সবার আগে দৌড় শেষ করেন বুকানন। তার সময় ছিল ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট ১৪ সেকেন্ড। নারীদের মধ্যে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করেন প্যাশলি। তিনি সময় নেন ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিট ২৮ সেকেন্ড।
দিনের সবচেয়ে মানবিক গল্পটি লিখেছেন সিডনির ফাইভ ডকের টবি ফুলার। ২৩ বছর বয়সে মাল্টিপল মায়েলোমা নামের রক্তের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন তিনি। কেমোথেরাপি চললেও নিজেকে ম্যারাথন থেকে সরিয়ে রাখেননি। চিকিৎসার ধকল নিয়েই ৩ ঘণ্টা ১৮ মিনিটে দৌড় শেষ করেন ফুলার। কেমোথেরাপি নেওয়া অবস্থায় কোনো রোগীর দ্রুততম ম্যারাথন সম্পন্ন করার কীর্তি হিসেবে তাঁর এই অর্জন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পেয়েছে।
ফিনিশিং লাইনে পৌঁছে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ফুলার। প্রতিটি কিলোমিটার তার জন্য কঠিন ছিল বলে জানান তিনি। প্রত্যাশিত সময় না পেলেও শেষ পর্যন্ত সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে পারায় আনন্দ প্রকাশ করেন। কঠিন এই লড়াইয়ের পর প্রিয়জনদের সঙ্গে কারি খেয়ে দিনটি উদ্যাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
বিশ্বসেরা অ্যাথলেটদের রেকর্ডের সঙ্গে ফুলারের জীবনযুদ্ধ যোগ হয়ে সিডনির আয়োজনটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। আয়োজকদের হিসাবে, ম্যারাথনটির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন দাতব্য কাজের জন্য ৩৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরসের অংশ হিসেবে টানা দ্বিতীয়বারের এই আয়োজনে তাই শুধু বিজয়ীদের সময়ই লেখা হয়নি। সিডনির পথে লেখা হয়েছে ফিরে আসার গল্প, শারীরিক সীমা অতিক্রমের গল্প এবং কঠিন রোগের কাছেও হার না মানার গল্প।