অস্কার মনোনীত আইরিশ অভিনেতা কলিন ফ্যারেল ওয়েব সিরিজ ‘সুগার’-এর দ্বিতীয় মৌসুমে নাম ভূমিকায় ফিরেছেন। এর আগে ‘দ্য পেঙ্গুইন’ সিরিজে মুগ্ধ করেছেন তিনি। ৫০ বছর বয়সী এই তারকাকে প্রশ্ন করেছেন জনি হক। ‘সুগার’ সিরিজে অভিনয়ের পাশাপাশি আপনি একজন নির্বাহী প্রযোজক। একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ দেখেছেন?
ভালোই। বলতে গেলে, দুই মৌসুমেই আমরা শুটিং করার সময় পর্যন্ত গল্প ও চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করেছি। অর্থাৎ শুটিং চলাকালীনও লেখা চলছিল। আমি অবশ্য কাউকে এভাবে কাজ করার পরামর্শ দেব না (হাসি)। কারণ, বিষয়টি বেশ জটিল ও কঠিন ছিল। তবে সৃজনশীল প্রক্রিয়ায় কিছুটা প্রভাব রাখার এবং সরাসরি যুক্ত থাকার সুযোগ পাওয়া ভালো ছিল। কারণ, জন সুগার চরিত্রকে আমি বেশ ভালোভাবেই চিনি। অত্যন্ত ভালো এবং নীতিবান এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা অসাধারণ। তবে তারও নিজস্ব সংগ্রাম আছে। সেসবের মধ্যেও সহিংসতার মুহূর্ত ও বিভ্রান্তি আসে। কিন্তু সে নিজের জীবনের সব সমস্যার জন্য বাইরের পৃথিবীকে দোষারোপ করে না; বরং জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতার মোড়ে সে বারবার নিজের ভূমিকা নিয়ে ভাবতে থাকে। কোনো ঘটনার জন্য নিজের কোনো দায় বা ভূমিকা ছিল কি না, সেই বিষয়েও আত্মসমালোচনা করে। সিরিজটির জগৎ এবং এতে কাজ করা আমার জন্য খুব উপভোগ্য। লস অ্যাঞ্জেলেসে শুটিংও দারুণ আনন্দের।
একজন আইরিশ হিসেবে লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাস করতে গিয়ে কখনো কি নিজেকে বহিরাগত মনে হয়েছে?
দেখুন, পৃথিবীর যেকোনো জায়গাতেই মানুষ নিজেকে বহিরাগত মনে করতে পারে। যখন প্রথম লস অ্যাঞ্জেলেসে আসি, তখন আমার বয়স সম্ভবত ২৩ বছর, অবশ্যই নিজেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন ও বহিরাগত মনে করেছিলাম। প্রথমবার লস অ্যাঞ্জেলেসে এসে বেশ একাকিত্ব অনুভব করেছিলাম। তার ওপর লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের ব্যবসায়িক দিক, বিশেষ করে হলিউডের ব্যবসাকেন্দ্রিক দিকটি আমাকে কিছুটা অস্থির ও বিচলিত করত। তবু লস অ্যাঞ্জেলেসকে সবসময়ই আমার কাছে আকর্ষণীয় লেগেছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে শুটিং করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
অসাধারণ। সত্যিই এখানেই শুটিং করা আমার জন্য দারুণ অভিজ্ঞতা ছিল। আমি এখানেই থাকি। ফলে কাজের পাশাপাশি পরিবার ও বন্ধুদের কাছে থাকতে পেরেছি। এটি অত্যন্ত স্বতন্ত্র ও বিশেষ ধরনের একটি শহর। এখানে অসংখ্য ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এই শহরে বসবাস করছেন। এটাই আমার কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। আর প্রোডাকশন ক্রু বা চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরি দলের ক্ষেত্রে লস অ্যাঞ্জেলেসের চেয়ে ভালো মানুষ পৃথিবীর আর কোথাও আছে বলে মনে করি না। এই সিরিজে সম্ভবত ৩০০-৫০০ মানুষ কাজ করেছেন। তাই চার-পাঁচ মাস ধরে সবাইকে একসঙ্গে লস অ্যাঞ্জেলেসে কাজ করার সুযোগ দেওয়া সত্যিই এক বড় উপহার। প্রথম ও দ্বিতীয় মৌসুম দুটোতেই আমাদের অনেক একই ক্রু সদস্য কাজ করেছেন।
এবার ‘দ্য পেঙ্গুইন’ প্রসঙ্গে আসি। হিথ লেজার খলচরিত্র জোকারকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন, তেমনি আপনিও পেঙ্গুইন চরিত্রটিকে নতুন এক মাত্রা দিয়েছেন।
জোকার চরিত্রে হিথের অভিনয় অতুলনীয়। সত্যিই! গত সপ্তাহেই আমার বাচ্চাদের নিয়ে ‘দ্য ডার্ক নাইট’ দেখছিলাম। এ সিনেমায় সে সত্যিই অসাধারণ ছিল। তার অভিনয় একটুও পুরনো হয়ে যায়নি। আজও দেখলে মনে হয় এটি একেবারে নতুন। প্রতিবার দেখলেই মনে হয়, এটি বিশুদ্ধ জাদু। সে এতটাই বিপজ্জনক, এতটাই উন্মাদ, আবার একই সঙ্গে মজার, আকর্ষণীয় এবং ভয়ংকর। হিথের অভিনয়ের প্রতিটি ছোট্ট সূক্ষ্মতা এত সুন্দর। কিন্তু একই সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সে শুধু নিজের উপস্থিতি দিয়ে পুরো জায়গাটা দখল করে নেয় না। অবশ্যই সে দর্শকের সম্পূর্ণ মনোযোগ আকর্ষণ করে; কিন্তু অন্যদের অভিনয়ের জায়গাটুকুও সে রেখে দেয়। সে ম্যাগি জিলেনহালকে অভিনয়ের যথেষ্ট জায়গা দিয়েছে এবং অবশ্যই ক্রিশ্চিয়ান বেলকে ব্রুস ওয়েন চরিত্রে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। সে সত্যিই অসাধারণ ছিল।
অতীতে ড্যানি ডেভিটোসহ অনেক অভিনেতা পেঙ্গুইন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তারা কেউ কি আপনার অভিনয়কে প্রভাবিত করেছেন?
যখন পেঙ্গুইন চরিত্রে অভিনয় করছিলাম, তখন সচেতনভাবে অন্য কারও অভিনয়ের কথা ভেবে কাজ করিনি। সত্যি বলতে, ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কোনো অভিনেতার পেঙ্গুইন চরিত্রায়ণ মাথায় রাখিনি। আমার একজন বন্ধু বলেছিল, ‘দ্য আনটাচেবলস’-এ আল ক্যাপোন চরিত্রে রবার্ট ডি নিরোর অভিনয়ের কথা। কিন্তু সত্যিই সচেতনভাবে এসব অভিনয়ের কথা চিন্তা করছিলাম না। তবে এটাও অস্বীকার করব না, একজন অভিনেতা হিসেবে জীবনে দেখা প্রতিটি অভিনয়ের ছোট ছোট অংশ কোনো না কোনোভাবে কাজের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। একজন দর্শক হিসেবে যে অভিনয়গুলো দেখে প্রভাবিত হই, যেগুলো আমাদের গড়ে তোলে, যে চরিত্রায়ণগুলো অভিনয়বোধকে সমৃদ্ধ করে, স্মৃতির সেই বিশাল ভাণ্ডার থেকেই কোনো কোনো উপাদান অবচেতনভাবে নিজের কাজের মধ্যে চলে আসে। অর্থাৎ, সচেতনভাবে কাউকে নকল করছি না; কিন্তু একজন দর্শক ও অভিনেতা হিসেবে জীবনে যা কিছু প্রভাবিত ও সমৃদ্ধ করে, সেসব স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার বিশাল ভাণ্ডার থেকে কোনো না কোনো উপাদান স্বাভাবিকভাবেই অভিনয়ে জায়গা করে নিতে পারে।
কার অভিনয় আপনাকে অনুপ্রাণিত করেছে?
আমি তো সবকিছু থেকেই অনুপ্রেরণা পাই। জানি উত্তরটা হয়তো খুব সাধারণ বা কিছুটা গতানুগতিক শোনাচ্ছে; কিন্তু এটাই সত্যি। আমি সিনেমা ভালোবাসি। টিম বার্টনের ‘ব্যাটম্যান’ চলচ্চিত্রগুলোতে পেঙ্গুইন চরিত্রে ড্যানি ডেভিটো যা করেছিলেন, আমি সেটি ভীষণ পছন্দ করি। তখনো ভালোবাসতাম, এখনো ভালোবাসি। তার অভিনয়ের মধ্যে দারুণ এক স্বাদ ও আনন্দ আছে। ১৯৬৬ সালের ‘ব্যাটম্যান’ সিরিজে বার্গেস মেরেডিথ যা করেছিলেন, সেটিও আমার খুব পছন্দ।
‘দ্য পেঙ্গুইন’-এ ওজ কবের মতো জটিল চরিত্র এবং এখন জন সুগারের মতো চরিত্রে অভিনয়ের পর মানবস্বভাবের কোন বিষয়টি আপনাকে বেশি উদ্বিগ্ন করে-সহিংসতার ক্ষমতা, নাকি সেই সহিংসতাকে যুক্তি দিয়ে ন্যায্য প্রমাণ করার ক্ষমতা?
(হাসি) দুটোই উদ্বেগজনক। আমার ধারণা, মানুষের সহিংস হয়ে ওঠার ক্ষমতা অত্যন্ত অস্বস্তিকর ও ভয়ংকর। আমাদের মধ্যে যে আপাতদৃষ্টিতে রক্তপিপাসু প্রবণতা দেখা যায়, সেটিও উদ্বেগের। আমাদের এই পৃথিবীতে লোভের যে ব্যাপক উপস্থিতি, সেটিও ভয়ংকর। কারণ লোভ থেকেই অনেক সময় ভয়াবহ সহিংসতার জন্ম হয়। আবার অনেক সময় আমরা নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না, আর সেই আবেগ নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতাও বড় ধরনের সহিংসতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। মানুষ হওয়া সত্যিই কঠিন। আমরা যদি একে অন্যকে সহযোগিতা ও সমর্থন না করি, তাহলে আমরা সবাই বিপদে পড়ব।
‘সুগার’-এর গল্প
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসকে পটভূমি করে নির্মিত অ্যাপল টিভি প্লাসের ‘সুগার’ সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র জন সুগার একজন ব্যক্তিগত গোয়েন্দা। এক ধনী চলচ্চিত্র প্রযোজক তার নিখোঁজ নাতনিকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেন জন সুগারকে। সেই তদন্তকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে যায় গল্প। সমসাময়িক ও প্রচলিত ধারার বাইরে ভিন্নমাত্রায় উপস্থাপন করা হয়েছে সিরিজটি। ২০২৪ সালের এপ্রিলে এর প্রথম মৌসুম মুক্তি পায়। প্রথম মৌসুম সমালোচকদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পায়। সিরিজের দ্বিতীয় মৌসুম মুক্তি পেয়েছে গত ১৯ জুন।
কলিন ফ্যারেলকে নিয়ে দুছত্র
হলিউডের ব্লকবাস্টার ও স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে আলাদা অবস্থান গড়েছেন কলিন ফ্যারেল। ক্যারিয়ারে তিনটি গোল্ডেন গ্লোবসহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি। এ ছাড়া অস্কার ও বাফটায় একবার করে এবং এমি অ্যাওয়ার্ডসে দুবার মনোনয়ন পেয়েছেন। তার অভিনীত সিনেমার তালিকায় রয়েছে ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’ (২০০২), ‘আলেকজান্ডার’ (২০০৪), ‘মায়ামি ভাইস’ (২০০৬), ‘ইন ব্রুজেস’ (২০০৮), ‘টোটাল রিকল’ (২০১২), ‘দ্য লবস্টার’ (২০১৫), ‘দ্য কিলিং অব আ সেক্রেড ডিয়ার’ (২০১৭), ‘দ্য বিগাইল্ড’ (২০১৭), ‘দ্য ব্যানশিজ অব ইনিশেরিন’ (২০২২)।