দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাবে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া সরকার সরাসরি ২৫টি এজেন্সি নির্বাচন করেছে। পাশাপাশি আরও ৩১২টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)ও এ কার্যক্রমে যুক্ত থাকবে।
আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগের সরকারের আমলে দুর্নীতি, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে বন্ধ হয়ে যাওয়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে একাধিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে আলোচনা করেন।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হিসেবে প্রথম ধাপে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে দেশটির কর্তৃপক্ষ নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
বিমানভাড়াসহ অভিবাসনসংক্রান্ত কোনো ব্যয় ছাড়াই এসব কর্মী মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রথম দফার কর্মীদের সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর মধ্য দিয়ে শ্রমবাজারটি পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচটি দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি এজেন্সি আগের অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় ছিল।
বাংলাদেশ সরকার ওই ৪২৩টি এজেন্সির মধ্যে আগের সরকারের সময় বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ দিয়ে বাকি সব এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল। দীর্ঘ ছয় মাসের ধারাবাহিক অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে এ বিশেষ সুযোগ দিয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
মালয়েশিয়া সরকার সরাসরি নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির পাশাপাশি বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনায় আরও ৩১২টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিয়েছে। এর সঙ্গে বোয়েসেলও যুক্ত থাকবে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, বিদ্যমান নিয়মতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাংলাদেশের ৩৩৮টি রিক্রুটিং এজেন্সির একযোগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর সুযোগ পাওয়া একটি ঐতিহাসিক অর্জন।
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো যাচাই-বাছাই করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বাছাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সরকারের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এজেন্সিগুলো নির্বাচন করা হয়েছে।
বর্তমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। এরপর নতুন সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ আরও ভালোভাবে রক্ষা হবে বলে আশা করছে সরকার।
শ্রমবাজার দ্রুত চালুর স্বার্থে বিদ্যমান মেডিকেল সেন্টারগুলোর বিষয়ে পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে প্রতিটি মেডিকেল সেন্টার সরেজমিনে পরিদর্শনের পর চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে।
তাই আপাতত মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত বিদ্যমান তালিকা থেকে বাংলাদেশের অনুরোধে আগের সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত মেডিকেল সেন্টারগুলো বাদ দিয়ে বাকি ১৬টি কেন্দ্রের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পাশাপাশি যত দ্রুত সম্ভব মালয়েশিয়ার তিন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে এসে নতুন নীতিমালার আলোকে মেডিকেল সেন্টারগুলো যাচাই-বাছাই করবে। এরপর পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ শুরু হবে।
মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরে অতীতের সব ধরনের হয়রানি বন্ধ, সরাসরি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে কাজে যোগদান এবং মালয়েশিয়ার শ্রম আইন অনুযায়ী নিয়মিত বেতন-ভাতা, আবাসন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
অভিবাসনসংক্রান্ত অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিং সেল ও হেল্পডেস্ক স্থাপন করা হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার চালু হওয়া নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। এ ধরনের তথ্যকে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হবে, তা এখনো প্রক্রিয়াধীন। যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
তাই মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি বা নির্দেশনা জারি না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করা, মেডিকেল পরীক্ষা না করানো এবং পাসপোর্ট জমা না দেওয়ার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগী, দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জ/শা