হাঁটা এমন একটি সহজ শারীরিক কার্যকলাপ, যা প্রায় সব বয়সী মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সহজেই যুক্ত করা যায়। নিয়মিত হাঁটা শরীরকে সক্রিয় রাখার পাশাপাশি হৃদ্স্বাস্থ্য, রক্তচাপ, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে হাঁটার সময় নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন—সকাল, বিকেল নাকি খাবারের পর, কোন সময়টি বেশি উপকারী? আবার ওজন কমাতে খালি পেটে হাঁটা কতটা কার্যকর, সেটিও অনেকের কৌতূহলের বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার জন্য হাঁটার নির্দিষ্ট কোনো ‘সেরা সময়’ নেই। বরং যে সময় নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস বজায় রাখা সম্ভব, সেটিই সবচেয়ে উপযোগী। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ে হাঁটার কিছু আলাদা সুবিধা রয়েছে।
সকালে হাঁটা দিনের শুরুতেই শরীরকে সক্রিয় করে তুলতে সাহায্য করে। যাঁদের সকালে সময় বের করা সহজ, তাঁদের জন্য এই সময় নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা সুবিধাজনক হতে পারে। দিনের ব্যস্ততা শুরুর আগেই হাঁটা শেষ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে কাজের চাপে ব্যায়াম বাদ পড়ার আশঙ্কাও কম থাকে।
তবে খালি পেটে হাঁটলেই সবার বেশি ওজন কমবে—এমন নয়। সুস্থ ব্যক্তিরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলে হালকা বা মাঝারি গতিতে খালি পেটে হাঁটতে পারেন। কিন্তু হাঁটার সময় মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিলে হাঁটা বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়া উচিত।
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরে গ্লাইকোজেন ও ইনসুলিনের মাত্রা তুলনামূলক কম থাকে। ফলে খালি পেটে হাঁটার সময় শরীর শক্তির জন্য কিছুটা বেশি সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে শুধু সকালে বা খালি পেটে হাঁটলেই ওজন কমবে। ওজন নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের পাশাপাশি খাবারের ধরন, মোট ক্যালরি গ্রহণ এবং সামগ্রিক জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ।
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে খাবারের পর অল্প সময় হাঁটা বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। খাবারের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্বাভাবিক বা আরামদায়ক গতিতে হাঁটলে খাবার-পরবর্তী রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে ইনসুলিন বা রক্তে শর্করা কমানোর নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহারকারীদের ব্যায়াম ও খাবারের সময়সূচি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মেনে চলা উচিত।
হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখার ক্ষেত্রেও হাঁটার নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুতগতিতে হাঁটা নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপের অংশ হলে তা হৃদ্যন্ত্রের সক্ষমতা, রক্তচাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। দিনের দীর্ঘ সময় বসে কাজ করতে হলে বিকেল বা সন্ধ্যায় কিছুক্ষণ হাঁটা নিষ্ক্রিয়তা কমানোর কার্যকর উপায়। এতে একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাসও ভাঙে।
যাঁদের সকাল ব্যস্ততায় কাটে, তাঁদের জন্য বিকেল বা সন্ধ্যার হাঁটা হতে পারে বাস্তবসম্মত বিকল্প। সারাদিনের কাজের পর কিছুক্ষণ হাঁটলে শরীর সক্রিয় রাখার পাশাপাশি মনও সতেজ হতে পারে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে খুব দ্রুতগতির বা দীর্ঘ সময়ের ব্যায়াম না করাই ভালো, বিশেষ করে এতে ঘুমের সমস্যা হলে।
রাতের খাবারের পর ১০ থেকে ১৫ মিনিট স্বাভাবিক গতিতে হাঁটাও দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানোর সহজ উপায়। এটি খাবারের পর রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে এবং খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপের পরামর্শ দেয়। অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ দিন প্রায় ৩০ মিনিট করে দ্রুত হাঁটা একটি ভালো লক্ষ্য হতে পারে।
সবশেষে, একেবারেই না হাঁটার চেয়ে দিনের যেকোনো সময় নিয়মিত হাঁটা ভালো। তাই সকাল, বিকেল কিংবা খাবারের পর—যে সময়টি আপনার জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই এবং নিয়মিত চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, সেই সময়টিই হাঁটার জন্য বেছে নেওয়া সবচেয়ে ভালো।
জ/উ