দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে একের পর এক ইতিহাস লিখেছেন লিওনেল মেসি। শুরুটা হয়েছিল লাল কার্ড দিয়ে, মাঝের পথজুড়ে ছিল হতাশা ও ফাইনালে হার, আর শেষ পর্যন্ত এসেছে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের মতো কাঙ্ক্ষিত শিরোপা।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান মেসি। ৩৯ বছর বয়সে নেওয়া এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার দুই দশকের মহাকাব্যিক পথচলার সমাপ্তি ঘটেছে।
২০০৫ সালে জাতীয় দলে অভিষেক থেকে ২০২৬ বিশ্বকাপ পর্যন্ত মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচ খেলেছেন এবং করেছেন ১২৫ গোল। জিতেছেন ২০২১ ও ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ।
তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ছিল—
২০০৫: অভিষেকেই লাল কার্ড
১৭ আগস্ট ২০০৫। বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক হয় মেসির। বয়স তখন মাত্র ১৮ বছর। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। জাতীয় দলের হয়ে মেসির শুরুটা তাই ছিল হতাশায় মোড়া।
২০০৬: প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম গোল
অভিষেকের মাত্র এক বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখেন মেসি। ২০০৬ সালের ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ১৮ বছর বয়সী এই তারকা। মাঠে নেমেই গোল করেন মেসি, পাশাপাশি একটি অ্যাসিস্টও করেন। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ৬-০ গোলে।
২০১০: ম্যারাডোনার অধীনে বিশ্বকাপ
২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা। একদিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ম্যারাডোনা, অন্যদিকে তার উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত তরুণ মেসি—একই বিশ্বকাপে দুজনের উপস্থিতি ছিল বিশেষ এক অধ্যায়। তবে মাঠের ফলাফল আর্জেন্টিনার পক্ষে সুখকর হয়নি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা।
২০১৪: ফাইনালে হার, হাতে গোল্ডেন বল
২০১৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠেন মেসি। তার নেতৃত্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় শিরোপার লড়াইয়ে। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ে গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানে মারিও গোটশের গোলে শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা। তবে পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে মেসির হাতে ওঠে গোল্ডেন বল।
২০১৬: কোপা হারের পর অবসরের ঘোষণা
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি আসে ২০১৬ সালে।
কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচে পেনাল্টি মিস করেন মেসি। টানা কয়েকটি বড় ফাইনালে ব্যর্থতার হতাশায় ম্যাচের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।
তবে সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। সমর্থকদের আবেগ ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে আবারও জাতীয় দলে ফিরে আসেন মেসি। আর সেই প্রত্যাবর্তনের পরই শুরু হয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল অধ্যায়।
২০২১: অবশেষে কোপা আমেরিকা জয়
২০১৬ সালের কান্না থেকে ২০২১ সালের আনন্দ-মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে বদলে যায় মেসির আন্তর্জাতিক গল্প। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনালে স্বাগতিকদের ১-০ গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটে। আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জয়ের স্বাদ পান মেসি।
২০২২: মেক্সিকোর বিপক্ষে জীবন বদলে দেওয়া গোল
কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর চাপ বাড়ছিল মেসিদের ওপর। ঠিক তখনই ৬৪ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে মেক্সিকোর জালে বল পাঠান অধিনায়ক। গোলটি শুধু ম্যাচের গতিপথ বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ভাগ্য। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
এরপরের গল্পটা হয়ে ওঠে ইতিহাস।
২০২২: অবশেষে বিশ্বকাপ হাতে মেসি
১৮ ডিসেম্বর ২০২২-আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় দিন।
ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসি করেন দুটি গোল। টাইব্রেকারেও আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম পেনাল্টিটি সফলভাবে নেন তিনি। গনসালো মন্তিয়েল শেষ পেনাল্টি জালে জড়ানোর পর মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ ফিরে আসে আর্জেন্টিনায়।
কাতারে মেসি শুধু বিশ্বকাপই জেতেননি, জিতেছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও।
২০২৬: বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড
৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসিকে ঘিরে ছিল নানা প্রশ্ন। কিন্তু বয়সকে যেন আবারও ভুল প্রমাণ করেন তিনি।
বিশ্বকাপের এই আসরেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপটি শেষ হয় আরও কিছু রেকর্ডের মধ্য দিয়ে। বিশ্বকাপের মঞ্চে তার ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং পারফরম্যান্স তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় বিশ্বকাপ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত করে।
২০২৬: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র পর এই লড়াই পেয়েছিল নতুন মাত্রা।
২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। ম্যাচে মেসি দুটি অ্যাসিস্ট করেন। ফলে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার আরেকটি ঐতিহাসিক জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
২০২৬: শেষ অধ্যায়, স্পেনের কাছে ফাইনালে হার
শেষ পর্যন্ত মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল।
স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ফলে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও শেষ হয়ে যায়।
তবে ফাইনালের পরই মেসি অবসরের সিদ্ধান্ত নেননি প্রকাশ্যে। পরে তিনি জানান, ফাইনালের দুই দিন পরই অবসরের বার্তা লিখে রেখেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর সেই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।
দুই দশকের মহাকাব্যিক সমাপ্তি
২০০৫ সালে লাল কার্ড দিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। এরপর এসেছে বিশ্বকাপের হতাশা, একের পর এক ফাইনালে হার, অবসরের ঘোষণা, আবার প্রত্যাবর্তন-তারপর কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জয়।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গল্প তাই শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি অপেক্ষার, ব্যর্থতার, ফিরে আসার এবং শেষ পর্যন্ত স্বপ্নপূরণের গল্প।
২০১৬ সালে যে খেলোয়াড় জাতীয় দলের হয়ে আর কিছু করতে না পারার হতাশায় অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই মেসিই পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হার দিয়ে শেষ হয়েছে তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘদিন অমলিন থাকবে।