যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পর এবার ইউরোপের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের কাছ থেকেও ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আজ বুধবার আনুষ্ঠানিক চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, রাজধানীর একটি হোটেলে ‘স্প্রেডিং আওয়ার উইংস টুগেদার’ শিরোনামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ চুক্তি সই হবে। তবে ১০টি উড়োজাহাজ কিনতে মোট কত অর্থ ব্যয় হবে এবং কত বছরের মধ্যে সেগুলো বাংলাদেশে আসবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। এর সবগুলোই বোয়িংয়ের তৈরি। বোয়িং ও এয়ারবাসের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী আরও ৩৫টি উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বিমানের বহরে মোট উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৪টিতে।
এত সংখ্যক উড়োজাহাজ বাংলাদেশের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। পাশাপাশি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে বাংলাদেশ এসব উড়োজাহাজ কিনছে—এমন সমালোচনাও রয়েছে।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘ফ্লিট এক্সপ্যানশন প্ল্যান ২০২৬-২০৩৫’ অনুযায়ী ২০৩৫ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে মোট ৪৭টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন হবে। সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান পরিবহনের হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও বহর সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে বলে সরকার মনে করছে।
বাংলাদেশ শুরু থেকেই মূলত যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি উড়োজাহাজ ব্যবহার করে আসছে। তবে ২০২৩ সাল থেকে ইউরোপের দেশগুলোও বাংলাদেশে উড়োজাহাজ বিক্রির চেষ্টা জোরদার করে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরের সময়ও বাংলাদেশকে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা অনেকটাই এগিয়ে নিয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার আলোচনা অনেকটা আড়ালে চলে যায়। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ফেরার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশকে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব দেন।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। সেই শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর শর্তও দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে বিএনপি সরকারও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে।
এর ধারাবাহিকতায় গত এপ্রিল মাসে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩১ সাল থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ১৪টি উড়োজাহাজ সরবরাহ করা হবে। এতে ব্যয় হবে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
এরপর গত আগস্টে ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গর জানান, বাংলাদেশ বোয়িংয়ের তৈরি আরও কয়েকটি উড়োজাহাজ কিনবে। এ জন্য গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে ধন্যবাদ জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এরপর গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বাংলাদেশে বোয়িং ও এয়ারবাসের মধ্যে প্রতিযোগিতায় ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বোয়িংয়ের পাশাপাশি ইউরোপের এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বাংলাদেশের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। এয়ারবাসের একটি ‘অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতামূলক অফার’ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ওই সময় বিমানমন্ত্রী রাশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছিলেন, শুধু বোয়িং নয়, এয়ারবাসের কাছ থেকেও উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ।
এরপর প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় গত ২৩ সেপ্টেম্বর আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়। এসব উড়োজাহাজ কিনতে ব্যয় হবে ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর ফলে সব মিলিয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে, যার মোট ব্যয় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭৮ হাজার কোটি টাকা।
তবে এসব চুক্তির কারণে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ তৈরি হবে না বলে জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, উড়োজাহাজগুলোর পুরো মূল্য এখনই পরিশোধ করতে হবে না। যে সময়ে প্রতিটি উড়োজাহাজ সরবরাহ করা হবে, তখন ধাপে ধাপে এর মূল্য পরিশোধ করা হবে।
জ/শা