ট্রাম্প-শি বৈঠক: সম্পর্কের সুর নরম হলেও নেপথ্যে গভীর সংশয়

জবাবদিহি ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত সপ্তাহের বৈঠকে কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) তার আরও কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে বেইজিং। এতে দুই দেশের আলোচনার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ফলাফল সামনে এসেছে।

2026-09-28T18:12:34+06:00
2026-09-28T18:37:02+06:00
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
আন্তর্জাতিক
ট্রাম্প-শি বৈঠক: সম্পর্কের সুর নরম হলেও নেপথ্যে গভীর সংশয়
জবাবদিহি ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:১২ পিএম  আপডেট: ২৮.০৯.২০২৬ ৬:৩৭ পিএম
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত সপ্তাহের বৈঠকে কী কী বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) তার আরও কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে বেইজিং। এতে দুই দেশের আলোচনার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ফলাফল সামনে এসেছে।

তবে বৈঠক শেষে কোনও যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়নি। বড় ধরনের কোনও চুক্তি বা যুগান্তকারী সমঝোতার ঘোষণাও আসেনি। বরং ওয়াশিংটন ও বেইজিং আলাদাভাবে বৈঠকের বিবরণ প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষকদের কাছে বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দুই নেতার মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সম্পর্ক উষ্ণ করার নানা বার্তা এলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এখনও একে অপরের প্রতি যথেষ্ট সতর্ক ও সন্দিহান- আলাদা বিবৃতি প্রকাশের ঘটনা তারই ইঙ্গিত দিতে পারে।

বৈঠকের পর রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চারটি বিষয় সম্পর্কে কিছুটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনও অন্ধকার রয়ে গেছে।

বেইজিং জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন নতুন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংলাপ শুরু করতে সম্মত হয়েছে। আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে এ বিষয়ে পরবর্তী আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

উন্নত এআই প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তি যখন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই উদ্যোগ থেকে বোঝা যায় এমন একটি প্রযুক্তিকে ঘিরে কিছু নিরাপত্তা-সীমারেখা ও যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তা দুই দেশই উপলব্ধি করছে। ব্যবসা থেকে সামরিক পরিকল্পনা প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।

দুই দেশ এআই-সংক্রান্ত কোনও ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে তা নিয়ে সরাসরি যোগাযোগের একটি চ্যানেলও চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো এআইকে ঘিরে কোনও ভুল বোঝাবুঝি, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা হঠাৎ তৈরি হওয়া পরিস্থিতি যেন বৃহত্তর সংঘাতে রূপ না নেয়।

ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে এআই নিয়ে যেকোনও সমঝোতার দিকে বিশেষ নজর ছিল। কারণ, মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকসহ কয়েকটি কোম্পানি এআইয়ের উন্নয়ন ধীর করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকারি ওয়েবসাইটে অননুমোদিত প্রবেশ এবং মার্কিন সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইটে হস্তক্ষেপের মতো ঘটনাও এআই-নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সোমবার প্রথমবারের মতো চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি আগামী ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

স্বল্পমেয়াদি এই সমঝোতার ফলে বছরের শেষ দিকে দুই নেতার আবারও সাক্ষাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নভেম্বরে ট্রাম্প চীনের শেনঝেনে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলনে যোগ দেবেন। আর ডিসেম্বরে শি জিনপিং মিয়ামিতে জি-২০ সম্মেলনে যাওয়ার কথা রয়েছে।

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির নেতাদের এত ঘন ঘন বৈঠক করা বিরল। তবে বেইজিং বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য বাড়াতে চেয়েছিল। সে তুলনায় মাত্র দুই মাসের এই মেয়াদ বৃদ্ধি বড় সাফল্যের বদলে সীমিত অর্জন হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তবে চীন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর শুল্ক কমানোর সুবিধা পেয়েছে। এর পাল্টা হিসেবে বেইজিং থেকেও শুল্ক কমানোর প্রত্যাশা রয়েছে।

ফলে চীনের খেলনা, ছোটখাটো গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি এবং বড়দিনের সাজসজ্জার সামগ্রীর মতো পণ্য মার্কিন বাজারে তুলনামূলক কম শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পাবে।

এছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, চীন ২০২৭ ও ২০২৮ সালে প্রতিবছর অন্তত ১ কোটি মেট্রিক টন কয়লা কিনবে।

তবে বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো কী বিষয়ে কোনও ঘোষণা আসেনি।

চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থের রফতানি বাড়ানোর বিষয়ে কোনও উল্লেখ নেই। একইভাবে উন্নত প্রযুক্তির মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর চীনে প্রবেশের ওপর থাকা বিধিনিষেধ শিথিল করারও কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, বাণিজ্যিক উত্তেজনা কিছুটা কমানোর উদ্যোগ থাকলেও দুই দেশের প্রযুক্তি ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার মূল বিরোধগুলো এখনও বহাল রয়েছে।

ট্রাম্প-শি বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত হোয়াইট হাউসের তথ্যপত্রে তাইওয়ানের কোনও উল্লেখ নেই। কিন্তু বেইজিংয়ের প্রকাশিত বিবরণ থেকে স্পষ্ট, বিষয়টি শি জিনপিংয়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

চীনা বিবরণ অনুযায়ী, শি ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার এবং বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এর আগে মে মাসে দুই নেতার বৈঠকের পর ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছিলেন, শি তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলেন চীন তাইওয়ানে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে কি না।

তখন ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিষয়টির উত্তর কেবল তিনিই জানেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধ করতে মার্কিন বাহিনীকে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ মাইল দূরে যেতে হবে কি না।

কিন্তু এবার এ বিষয়ে ট্রাম্প অনেক কম কথা বলেছেন।

সপ্তাহান্তে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমরা এ বিষয়ে খুব বেশি কথা বলিনি।”

ট্রাম্প আরও বলেন, “এই মুহূর্তে সব ঠিক আছে। বিষয়টি এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি (শি) আমার অবস্থান খুব ভালোভাবেই বোঝেন।” এই নীরবতাকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এর আগে ট্রাম্প তাইওয়ানের জন্য প্রস্তাবিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র প্যাকেজকে চীনের সঙ্গে আলোচনায় একটি ‘খুব ভালো দর-কষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কয়েক মাস ধরে ওই অস্ত্র প্যাকেজ আটকে রয়েছে।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ডেভিড পার্ডু  বলেন, ট্রাম্প বৈঠকের সময় শিকে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বিষয়টি পরিষ্কার করে জানায়, মার্কিন আইন চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমতি দেয় না এবং এমন কোনও পরিকল্পনাও নেই।

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে মনে করে। অধিকাংশ দেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ, তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। তবে ওয়াশিংটন তাইওয়ানকে জোর করে দখলের যেকোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এবং দ্বীপটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে।

ট্রাম্প-শি বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো চীনের আর্থিক খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা।

বেইজিং জানিয়েছে, আরও বেশি বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট ব্যাংক, বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ও বিমা কোম্পানিও রয়েছে চীনে ব্যবসা করার এবং কার্যালয় খোলার জন্য আবেদন করতে পারবে।

তবে এসব প্রতিষ্ঠানের আবেদন অনুমোদন হবে চীনের বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী।

এই শেষ শর্তটিই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, চীন দরজা কিছুটা খুলছে ঠিকই, কিন্তু কারা সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে, তা এখনও বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।

বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে চীনের নিয়ন্ত্রক বাধা, লাইসেন্স পাওয়ার জটিলতা এবং দেশ ছাড়ার ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। ফলে কাগজে-কলমে বাজারে প্রবেশের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে ব্যবসা সম্প্রসারণ কঠিন হয়ে থাকে।

দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল বাড়ানোর উপায় নিয়েও আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে বেইজিং। তবে কীভাবে ফ্লাইট বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে বিশ্বের ৭৫টিরও বেশি দেশের নাগরিকদের ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগ দিলেও চীন এখনও মার্কিন নাগরিকদের জন্য একই সুবিধা দেয়নি।

অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর এখনও চীন ভ্রমণকে ‘লেভেল ২’ সতর্কতার আওতায় রেখেছে। দেশটির নাগরিকদের ‘বাড়তি সতর্কতা’ অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর কারণ হিসেবে নির্বিচারে আইন প্রয়োগ, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং আটক হওয়ার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, দুই দেশ ব্যবসা ও মানুষের যাতায়াত বাড়ানোর কথা বললেও বড় কিছু বাধা এখনও রয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প ও শি’র বৈঠক থেকে যোগাযোগের পরিধি বেড়েছে, কিন্তু বড় নীতিগত পরিবর্তন এখনও আসেনি।

এআই, উন্নত প্রযুক্তি, তাইওয়ান এবং বাণিজ্য দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর কোনওটি থেকেই মৌলিক বিরোধ দূর হয়নি।

বরং বৈঠকের ফলাফল দুই নেতার জন্য পরিচিত একটি পথই দেখিয়েছে আরও যোগাযোগের ব্যবস্থা, সীমিত অর্থনৈতিক ছাড় এবং সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার কিছু প্রস্তাব।

বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে নিয়মিত সংলাপ চালিয়ে যাওয়া তুলনামূলক সহজ। কিন্তু নিজেদের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে এসে বড় ধরনের আপস করানোই যে সবচেয়ে কঠিন কাজ, ট্রাম্প-শি বৈঠকের পরও সেটিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সূত্র: বিবিসি


জ/রা




  বিষয়:   যুক্তরাষ্ট্র  ইসরায়েল  ইরান  মধ্যপ্রাচ্য  যুদ্ধ  হরমুজ প্রণালী  চীনশি জিনপিং 



Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]