ট্রাম্পের সামনে একাধিক সংকট, বদলে যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থার সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

2026-09-22T18:17:54+06:00
2026-09-22T18:17:54+06:00
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
আন্তর্জাতিক
ট্রাম্পের সামনে একাধিক সংকট, বদলে যাচ্ছে বিশ্বব্যবস্থার সমীকরণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:১৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বিশ্ব পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ আর নিজ নিজ ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই। এর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ মানবসভ্যতার জন্য অস্তিত্বগত হুমকি তৈরি করতে পারে-এমন আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখী জ্বালানি মূল্য, বৈষম্য, বন্যা, দাবানল ও তীব্র তাপপ্রবাহ বৈশ্বিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

এমন পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

নিউইয়র্কে চলমান জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে প্রায় ১৩০টি দেশের নেতা অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যেই জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সাধারণত এ ধরনের সংকটকালে যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বৈশ্বিক অস্থিরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘে ট্রাম্পের ভাষণের সামনে একাধিক সংকট

এই প্রেক্ষাপটেই আজ মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার কথা ট্রাম্পের। একই দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকও করবেন তিনি। এসব আলোচনায় ইরান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি গুরুত্ব পাবে।

তবে ট্রাম্প এমন এক সময়ে জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও তার নীতির সমালোচনা বাড়ছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ প্রায় সাত মাসে গড়িয়েছে। অথচ সংঘাত শুরুর দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, যুদ্ধ কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হতে পারে।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে তার অনুমোদন ৩২ শতাংশে নেমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অবশ্য ট্রাম্পের নিজের বক্তব্য এর বিপরীত। তিনি দাবি করে আসছেন, তার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা ও শক্তি বেড়েছে এবং বিশ্বে দেশটিকে আগের চেয়ে বেশি সম্মান করা হচ্ছে।

মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে আগের তুলনায় বেশি লেনদেনভিত্তিক করার বিষয়টি উঠে এসেছে। কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সম্প্রতি বলেছেন, ওয়াশিংটন থেকে আসা অস্থিরতা তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কানাডা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নির্ভরতা পুনর্বিবেচনা করছে। এর অংশ হিসেবে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কও বৈচিত্র্যময় করছে।

হুমকি ও শক্তি প্রয়োগে জোর

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এতে সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ এবং সরাসরি হুমকিকে কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ইরানের ক্ষেত্রেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। যুদ্ধ শুরুর পর ট্রাম্প বারবার তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কথা বলেছেন। সম্প্রতি ইরানকে নিয়ে আরও কঠোর সামরিক হুমকিও দিয়েছেন তিনি। তবে এর বিপরীতে প্রশ্ন উঠেছে-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি কি সত্যিই সীমাহীন?

বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধ সেই প্রশ্নটিকেই সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ এবং দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা যুদ্ধজাহাজগুলোর ক্লান্ত অবস্থাকে লেখক মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন।

ইরান যুদ্ধ কি বদলে দিচ্ছে শক্তির হিসাব?

ইরান যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সংঘাত দ্রুত শেষ হয়নি।

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানোকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেছে। জাতিসংঘে তার ভাষণেও ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না-এ অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করতে পারেন বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। লেখাটির যুক্তি হলো, আধুনিক ড্রোনভিত্তিক যুদ্ধ বড় শক্তিগুলোর সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে নতুনভাবে সামনে এনেছে। ইউক্রেনের যুদ্ধে রাশিয়া যেমন ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে, তেমনি ইরানের সঙ্গে সংঘাতও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে-এমনটাই লেখকের বিশ্লেষণ।

গ্রিনল্যান্ড নিয়েও বিতর্ক

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি আলোচিত বিষয় গ্রিনল্যান্ড। ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত এই অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়ে ট্রাম্প অতীতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের কথাও বলেছেন।

তবে এবার ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে একটি চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তিটির লক্ষ্য গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা এবং আগের উত্তেজনা প্রশমিত করা।

সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মিত্র দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডের রাজনীতিক টিলি মার্টিনুসেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সংকট বোঝাতে একটি উদাহরণ দিয়েছেন। তার ভাষায়, সবচেয়ে শক্তিশালী কুকুরটিও যদি একবার তার মালিককে কামড়ে দেয়, এরপর তাকে আর আগের মতো বিশ্বাস করা যায় না।

তবে ট্রাম্প একাই দায়ী নন

বিশ্লেষণটিতে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার জন্য শুধু ট্রাম্পকে দায়ী করা যায় না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, চীনের উত্থান, রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো সংকট ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অনেক আগেই শুরু হয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকের দীর্ঘ যুদ্ধও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছিল।

২০০১ সালের পর ওই দুই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। একই সঙ্গে এসব যুদ্ধ মার্কিন সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাও সামনে আনে।

অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার সংকটের শিকড় ট্রাম্পের আগের সময়েও ছিল। তবে লেখাটির মূল বক্তব্য হলো, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ও আচরণ সেই দীর্ঘদিনের পরিবর্তনকে আরও দ্রুত ও দৃশ্যমান করে তুলছে।

পুরোনো বিশ্বব্যবস্থা কি আর ফিরবে না?

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পরিবর্তন এবং মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী পিট বুটিগিগও মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেছেন, আগে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এ ধরনের পরিবর্তনকে অনেক দেশ সাময়িক ঘটনা হিসেবে দেখত। কিন্তু এখন তা একটি ধারাবাহিক প্রবণতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে দেশগুলোকে নতুন বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হতে হচ্ছে।

তার ভাষায়, পুরোনো ধারা ও প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের অবস্থায় ফিরে আসবে-এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

বিশ্লেষণটির শেষ প্রশ্নও সেখানেই-বিশ্ব কি এমন একটি নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, যেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আর আগের অবস্থায় ফিরবে না?

লেখকের মতে, ট্রাম্প এই পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নন। তবে তার অস্থির ও সংঘাতমুখী রাজনৈতিক শৈলী একসঙ্গে জমা হওয়া বৈশ্বিক সংকটগুলোকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ক্ষমতা ও নেতৃত্ব কতটা টেকসই-সেই পুরোনো প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সূত্র: সিএনএন

জ/উ






Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]