ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের হামলার নতুন ঢেউয়ের মুখে পড়েছে সৌদি আরব। তবে মিত্র দেশটির পাশে সামরিকভাবে দাঁড়াতে আপাতত নতুন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালাতে ওয়াশিংটনের কাছে বারবার সহায়তা চাইলেও রিপোর্ট প্রকাশের সময় পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে কোনো সামরিক অভিযান পরিচালনায় সম্মতি দেননি।
সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর, তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হুতিদের হামলার পরও যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থান ওয়াশিংটন-রিয়াদ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কী পরিমাণ সামরিক সহায়তা দেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক মোনা ইয়াকুবিয়ান ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’কে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এখনো দোদুল্যমান। সৌদিদের সঙ্গে আপাতত সামরিক অভিযানে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কে আরও উত্তেজনা তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মোনা ইয়াকুবিয়ানের ভাষ্য, এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা ঠিক কী ধরনের সহায়তা আশা করতে পারে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
সৌদি আরবে বেড়েছে হুতিদের হামলা
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুতিদের হামলার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গোষ্ঠীটি দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের তেল স্থাপনায় হামলা চালানোর পাশাপাশি তেলবাহী ট্যাংকারেও আক্রমণ করেছে। সৌদি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালানো হয়েছে।
একই সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলবর্তী এলাকাগুলোতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে হুতিরা। তাদের অগ্রযাত্রার মুখে সৌদি-সমর্থিত বাহিনী পিছু হটেছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি হুতিদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
এই পরিস্থিতি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তিনি সৌদি আরবকে ব্যবসা, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা সেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কেন সরাসরি অভিযানে যাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র?
ট্রাম্প প্রশাসনের হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান না চালানোর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান বৃহত্তর সংঘাত এবং জ্বালানির উচ্চমূল্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সামরিক সম্পদ ব্যবহার করছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক অভিযানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতও কমে গেছে।
লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুতিদের হামলার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার পূর্বসূরি জো বাইডেন—উভয় প্রশাসনের সময়ই যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। তবে এবার ওয়াশিংটনের কৌশল ভিন্ন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো সৌদি আরবকে অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে। সৌদি আরবের কাছে মার্কিন তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও রয়েছে।
এ ছাড়া গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের কাছে সম্ভাব্য ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে। তবে এসব যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের হাতে পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগবে। ফলে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় এই চুক্তির প্রভাব সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সৌদির বিমান হামলার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান
‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে বারবার বিমান হামলা চালাতে ওয়াশিংটনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল সৌদি আরব। তবে যুক্তরাষ্ট্র সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই সিদ্ধান্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে ধারণা প্রকাশ করা হয়েছে।
ট্রাম্প ও সৌদি যুবরাজের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তবে এই সম্পর্কের মধ্যেও বিভিন্ন সময়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
গত মার্চে মিয়ামিতে সৌদি আরব আয়োজিত একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে ট্রাম্প মোহাম্মদ বিন সালমানকে ‘দারুণ বন্ধু’, ‘বিজয়ী’ ও ‘যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
তবে প্রায় ২০ মিনিট পরই যুবরাজকে নিয়ে একটি অশালীন মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, মোহাম্মদ বিন সালমান ‘ভাবেননি যে তাকে আমার পেছনে এতটা তোষামোদ করতে হবে’।
হুতিদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ মতপার্থক্য দুই নেতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল কারেন গিবসন, যিনি একসময় ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ছিলেন, ‘ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস’কে বলেন, ‘এটি মোহাম্মদ বিন সালমান ভুলবেন না।’
গিবসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিক্রিয়া একটি বিষয় স্পষ্ট করছে-সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ হুমকির মুখে পড়েছে বলে রিয়াদ মনে করলেও যুক্তরাষ্ট্র সবসময় সামরিকভাবে যুদ্ধে জড়াবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সৌদি ঘাঁটি ব্যবহারে বাধা, হুতিদের সঙ্গে আলোচনা
হুতিদের ইস্যুতে এর আগেও সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেছে।
গত মে মাসে সৌদি আরব ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিল, বাণিজ্যিক জাহাজকে বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলে সহায়তার কোনো মার্কিন সামরিক অভিযানে সৌদি ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। এরপর ট্রাম্প একটি মার্কিন সামরিক পরিকল্পনা বন্ধ করে দেন।
রিয়াদের আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের অভিযান উপসাগরীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে হুতিদের আরও হামলা চালাতে উৎসাহিত করতে পারে।
তবে পরিস্থিতি বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনের সংঘাত থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা সৌদি আরব আবারও সেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।
হুতিরা জুলাইয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভেঙে দেয় এবং সৌদি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণার কথা জানায়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ওমানের মধ্যস্থতায় হুতিদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। হুতিদের এক কর্মকর্তা ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’কে জানিয়েছেন, তাদের লক্ষ্য থাকবে শুধু সৌদি জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা চালানো হবে না।
ট্রাম্পও বলেছেন, হুতিরা মার্কিন স্বার্থে হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
জোটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন
মোনা ইয়াকুবিয়ানের মতে, সৌদি আরব যদি হুতিদের হামলার মুখে একা পড়ে যায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র-সৌদি অংশীদারত্ব নিয়ে রিয়াদের আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
তার ভাষ্য, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতিদের ব্যাপক হামলার মধ্যেও যদি যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ বা স্বার্থ সরাসরি হুমকির মুখে না পড়ায় ওয়াশিংটন রিয়াদকে কার্যত একা লড়তে দেয়, তাহলে দুই দেশের অংশীদারত্বের ওপর খুব বেশি আস্থা তৈরি হবে না।
ফলে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের মার্কিন-সৌদি নিরাপত্তা অংশীদারত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। সূত্র: এনডিটিভি
জ/উ