পাকিস্তান-চীনের নতুন সীমান্ত চুক্তিতে তীব্র ক্ষুব্ধ ভারত

জবাবদিহি ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

2026-09-21T21:07:03+06:00
2026-09-21T21:07:03+06:00
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
আন্তর্জাতিক
পাকিস্তান-চীনের নতুন সীমান্ত চুক্তিতে তীব্র ক্ষুব্ধ ভারত
জবাবদিহি ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:০৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
হিমালয়ের বিরোধপূর্ণ একটি অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান ও চীনের নতুন সীমান্ত চুক্তিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। কয়েক দশক ধরে ওই এলাকায় পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে দিল্লি। তাদের দাবি, অঞ্চলটি ভারতের ভূখণ্ডের অংশ।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে দুর্গম পার্বত্য ওই এলাকায় সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণের উদ্যোগ নেয় পাকিস্তান ও চীন। দুই দেশ ‘পাকিস্তান-চীন বাউন্ডারি জয়েন্ট কমিশন’ গঠনের বিষয়ে চুক্তি করেছে। পাকিস্তান এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করে জানিয়েছে, এর মাধ্যমে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর হবে।

তবে ভারত এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতীয় ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করা এলাকায় পাকিস্তান-চীন কোনো সীমান্তের আইনগত ভিত্তি তারা স্বীকার করে না।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে কোনো সীমান্ত নেই। তথাকথিত যৌথ কমিশনকে আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।

চুক্তিটি মূলত পাকিস্তান-চীন সীমান্তের শাকসগাম উপত্যকাসহ পার্বত্য এলাকার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শাকসগাম উপত্যকা ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান চীনের কাছে হস্তান্তর করে। তবে ভারত এটিকে লাদাখের অংশ হিসেবে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে।

ভারতের দাবি, অঞ্চলটি ছিল সাবেক দেশীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ। পাকিস্তান অবৈধভাবে অঞ্চলটি দখল করার পর চীনের কাছে হস্তান্তর করে। তাই ১৯৬৩ সালের চুক্তিকে ভারত কখনো স্বীকৃতি দেয়নি এবং এটিকে অবৈধ ও অকার্যকর বলে মনে করে। এ কারণেই নতুন ঘোষণাটি ভারতের কাছে বিশেষভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, পাকিস্তানের অবৈধ ও জোরপূর্বক দখলে থাকা ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার আইনগত অধিকার পাকিস্তানের নেই।

অন্যদিকে পাকিস্তানের অবস্থান হলো, জম্মু ও কাশ্মীর এখনও একটি বিরোধপূর্ণ অঞ্চল। তাই চীনের সঙ্গে ১৯৬৩ সালের সীমান্ত চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার ভারতের নেই। ইসলামাবাদ চুক্তিটিকে বৈধ বলে মনে করে।

দিল্লির শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও গভর্ন্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জাবিন টি জ্যাকব বলেন, নতুন উদ্যোগটি পুরোপুরি নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং পুরোনো একটি ব্যবস্থাকে আবার সক্রিয় করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান চুক্তিতেই একটি যৌথ সীমান্ত কমিশনের বিধান ছিল। এখন মূল বিষয় হলো, এটি কোন সময়ে কার্যকর করা হচ্ছে।

জ্যাকবের মতে, এর সময় নির্ধারণের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে চীনের বিভিন্ন সীমান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণের বৃহত্তর উদ্যোগ এবং পাকিস্তানের অন্যান্য সীমান্তে সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার সময় চীন-পাকিস্তান সীমান্তে যোগাযোগ ও চলাচলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা অন্যতম।

তবে এই উন্নয়নে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে বলেও মনে করেন জ্যাকব। বিশেষ করে ১৯৬৩ সালের চুক্তির একটি ধারার সঙ্গে বর্তমান উদ্যোগের সম্পর্ক রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির ৬ নম্বর ধারায় কাশ্মীর বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর যে দেশ ওই ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার সঙ্গে চুক্তিটি পুনরায় আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক তথ্য ও গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও ভারতের জন্য বিষয়টি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে বলে মনে করেন জ্যাকব। তার মতে, চীনের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও তথ্যপরিসরে তুলনামূলক প্রভাব বেশি থাকায় দেশটি বিশ্বজুড়ে নিজেদের মানচিত্র ও অবস্থান তুলে ধরতে পারছে। অন্যদিকে ভারতের প্রতিক্রিয়া অনেক সময় অন্যান্য দেশের রাজধানীগুলো উপেক্ষা করতে পারে।

তবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনার বাস্তব দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে এরই মধ্যে বিস্তৃত অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) এবং কারাকোরাম মহাসড়ক অন্যতম।

যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বর্তমানে আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক একাডেমি এবং হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, নতুন কমিশনটি একই সঙ্গে বাস্তবধর্মী ও রাজনৈতিক।

তিনি বলেন, এটি দুটিরই সমন্বয়। সীমান্ত ও সীমানা নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানো, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং সিপিইসির সঙ্গে যুক্ত কৌশলগত অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখার জন্য এটি একটি ব্যবস্থা।

তবে এর মাধ্যমে ভারতকেও একটি বার্তা দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন হাক্কানি। তার মতে, কাশ্মীর ইস্যুতে বেইজিং এখনো পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গিকেই গুরুত্ব দেয়।

হাক্কানি বলেন, চীন কাশ্মীর নিয়ে ভারতের অবস্থান কখনও মেনে নেয়নি। গিলগিট-বালতিস্তানকেও চীন পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখে, ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়।

তার মতে, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপের পর পাকিস্তানের অবস্থানেও পরিবর্তন এসেছে। ২০১৯ সালে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মতো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৬৩ সাল থেকে চীনের সঙ্গে বাস্তবে যা হয়ে আসছে, সেটিকে এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পাকিস্তানের আপত্তি নেই।

বেইজিংয়ের জন্যও এই উদ্যোগ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ভারতের প্রতি নিজেদের অবস্থান জানানোর বৃহত্তর কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেন হাক্কানি।

তিনি বলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করা চীনের জন্য কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক; দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং ভারতের সামনে চীন-পাকিস্তান দুই দিক থেকে সম্ভাব্য চাপের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোষণার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। হাক্কানি বলেন, চীন সাধারণত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার কয়েক মাস বা এমনকি কয়েক বছর আগেই পরিকল্পনা করে। ফলে যৌথ সীমান্ত কমিশন কার্যকর করার সিদ্ধান্তও কিছু সময় আগেই নেয়া হয়ে থাকতে পারে।

তার মতে, সাম্প্রতিক ব্রিকস সম্মেলনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরের পর এই তথ্য প্রকাশের সময় নির্ধারণ করা হয়ে থাকতে পারে। এর মাধ্যমে পাকিস্তানকে কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়ে আশ্বস্ত করা এবং ভারতকে জানানো হয়েছে যে বহুপক্ষীয় যোগাযোগের অর্থ দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে চীনের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন নয়।

তবে প্রতিটি বিষয়কে ভারতের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন জ্যাকব। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার (এলএসি) ওপর এর কোনো তাৎক্ষণিক বা দৃশ্যমান প্রভাব নেই।

এ থেকে বোঝা যায়, গত সপ্তাহের ঘোষণার তাৎপর্য তাৎক্ষণিকভাবে হিমালয়ের বিরোধপূর্ণ সীমান্তের চিত্র বদলে দেয়ার চেয়ে ভারত যে ব্যবস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে, সেগুলোকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার মধ্যেই বেশি নিহিত।

ভারতের অবস্থান স্পষ্ট ও ধারাবাহিক উল্লেখ করে জয়সওয়াল বলেন, পাকিস্তানের অবৈধ দখল বলে ভারত যে ভূখণ্ডকে বিবেচনা করে, সেটিকে বৈধতা দেয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য এবং ভারতের সার্বভৌমত্বের ওপর এর কোনো প্রভাব নেই।

তবে হাক্কানির মতে, এই বিরোধ কেবল সীমান্তের আইনগত বিষয় নয়। তিনি বলেন, সীমান্ত ও সীমানা নিয়ে ভারত ও চীনের মূল মতবিরোধ ভূ-রাজনৈতিক, মানচিত্রগত নয়। তাই সীমান্ত নিয়ে আলোচনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর সমাধানেরও একটি সীমা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে চীনের দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করছে এবং বেইজিংয়ের সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠতা দিল্লির কাছে সেই বার্তাই অব্যাহতভাবে পৌঁছে দেবে।



জ/রা




  বিষয়:   চীন  পাকিস্তান  ভারত 



Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]