ভাঙাচোরা ভবন, তাবু আর টিনের অস্থায়ী ছাউনির নিচেই আবারও বই হাতে ফিরেছে গাজার শিশুরা। নেই নতুন খাতা-কলম, নেই স্কুলের ইউনিফর্ম কিংবা পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ। তারপরও দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর সরাসরি শ্রেণিকক্ষে ফেরার আনন্দে তাদের মুখে ফুটেছে স্বস্তি ও আশার ছাপ।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) গাজা উপত্যকায় নতুন শিক্ষাবর্ষের সরাসরি পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। যুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের কার্যক্রম চালু করেছে গাজার শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত অথবা ধ্বংস হয়েছে। শিক্ষা কর্মকর্তাদের হিসাবে, সংঘাতের কারণে প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার শিশু দীর্ঘদিন সরাসরি স্কুলে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।
খান ইউনিসের শিক্ষা পরিচালক ইব্রাহিম রমদান জানান, ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ২২ হাজার শিক্ষার্থী এবং ৫৩২ জন শিক্ষকসহ ৭৭০ জনের বেশি শিক্ষাকর্মী নিহত হয়েছেন। এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পর স্কুলে পাঠদান পুনরায় শুরু হওয়াকে তারা আশাব্যঞ্জক, তবে ভঙ্গুর একটি সূচনা হিসেবে দেখছেন।
খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মোয়ায়েদ আবু মুস্তফা জানায়, প্রায় তিন বছর আগে সর্বশেষ স্কুলে গিয়েছিল সে। নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনটিকে সে আনন্দ ও নতুন সাফল্যের সূচনা হিসেবে দেখছে।
তবে স্কুলে ফিরলেও স্বাভাবিক পরিবেশ পায়নি মোয়ায়েদ। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই—এমন একটি তাঁবুর মেঝেতে বসেই তাকে ক্লাস করতে হচ্ছে। ভালো জুতো কিংবা প্রয়োজনীয় খাতা-কলমও নেই তার। যুদ্ধের মধ্যে হারিয়েছে অনেক খেলার সঙ্গীকেও। তারপরও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মোয়ায়েদ বলে, যত প্রতিকূলতাই থাকুক, তাঁবুর নিচে বসেই তারা শিখবে।
বাস্তুচ্যুত পরিবারের সঙ্গে তাঁবুতে থাকা ১৫ বছর বয়সী সমর আবু সালমিও ফিরেছে অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে। একটি অস্থায়ী স্কুলের আঙিনায় দাঁড়িয়ে সে জানায়, দীর্ঘদিন মোবাইলের পর্দায় পড়াশোনা করতে হয়েছে। শিক্ষকদের সামনাসামনি দেখার সুযোগ ছিল না। এখন এক তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুতে গিয়ে হলেও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চায় সে।
যুদ্ধের আগের সময়ের কথা স্মরণ করে সমর জানায়, তখন খাতা, কলম, পোশাকসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ সহজেই এবং তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যেত।
গাজার বিভিন্ন এলাকায় এখন তেরপল, স্টিল, কাঠ ও তাঁবু দিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী স্কুল। কোথাও এসব পাঠশালা স্থাপন করা হয়েছে বালুর ওপর। আবার কোনো শ্রেণিকক্ষে ব্ল্যাকবোর্ড ও কয়েকটি গদি ছাড়া তেমন কোনো শিক্ষা উপকরণ নেই। কিছু স্কুলে এখনো বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো বসবাস করছে।
১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ামেন আবু সামরা জানায়, আগে আনন্দ নিয়েই স্কুলে যেত সে। কিন্তু এখন স্কুলে যাওয়ার সময়ও গুলি, রকেট ও হামলার আশঙ্কা মাথায় ঘুরতে থাকে। তীব্র রোদ ও গরমের মধ্যেই একটি তাঁবুর ভেতর বসে ক্লাস করতে হচ্ছে বলেও জানায় সে।
গাজার শিক্ষা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে ইউনিসেফের সহায়তায় অন্তত ৫ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অস্থায়ী স্কুল ও লার্নিং সেন্টারে সরাসরি পাঠদানে অংশ নেবে। যারা স্কুলে উপস্থিত হতে পারছে না অথবা গাজা ছেড়ে গেছে, তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমও চালু রাখা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বড় ধরনের সংঘাত সাময়িকভাবে কমলেও গাজার সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখনো উপত্যকার ৬০ শতাংশের বেশি এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে গাজায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
শিক্ষাসামগ্রীর সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির জন্য ইসরায়েলের আমদানিনিষেধকে দায়ী করেছেন গাজার স্থানীয় ব্যবসায়ী খালেদ আলিয়ান। তিনি বলেন, আগে যে খাতার দাম ছিল ৩ শেকেল বা প্রায় ১ ডলার, বর্তমানে সেটিই ১৫ শেকেলে বিক্রি হচ্ছে। তার ভাষ্য, প্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দামই এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
শিক্ষাসামগ্রী আটকে দেওয়া কিংবা স্কুলে হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের সামরিক সংস্থা কোগাট কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ইসরায়েল বরাবরই দাবি করে আসছে, হামাস সামরিক কাজে স্কুলগুলো ব্যবহার করে। অন্যদিকে হামাস শুরু থেকেই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
জ/শা