নদীতে নাব্যতা সংকট, রুট পাল্টাচ্ছে ইলিশ

জবাবদিহি ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

গবেষকদের আশঙ্কাই যেন সত্য হচ্ছে। গতিপথ বদলে উপকূল ছেড়ে গভীর সাগরে পাড়ি জমাচ্ছে রুপালি ইলিশ। ভারত থেকে নজিরবিহীনভাবে ইলিশ আমদানির ঘটনা পুরো সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

2026-09-16T08:51:10+06:00
2026-09-16T09:00:22+06:00
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
আন্তর্জাতিক
নদীতে নাব্যতা সংকট, রুট পাল্টাচ্ছে ইলিশ
জবাবদিহি ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৫১ এএম 
নদীতে নাব্যতা সংকট, রুট পাল্টাচ্ছে ইলিশ
গবেষকদের আশঙ্কাই যেন সত্য হচ্ছে। গতিপথ বদলে উপকূল ছেড়ে গভীর সাগরে পাড়ি জমাচ্ছে রুপালি ইলিশ। ভারত থেকে নজিরবিহীনভাবে ইলিশ আমদানির ঘটনা পুরো সংকটকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক আহরণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে ইলিশ সংকটের এক আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। গত তিন অর্থবছরের পরিসংখ্যান বলছে, ইলিশের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন। পরের বছরে উৎপাদন ৪১ হাজার ৮৫৫ টন কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে আরও ২৯ হাজার ১৯৯ টন কম।

জ্যেষ্ঠ ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমানের ভাষ্য, বাংলাদেশের জলসীমানায় সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ নদনদীতে বিগত তিন বছর ধরে ক্রমেই ইলিশ মাছ কমে আসছে। অনেক জায়গায় প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। একই সুর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সাজেদুল হকের। ইলিশ কমে যাওয়াকে তিনি চিন্তার বিষয় বলে জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ইলিশসহ সামুদ্রিক মৎস্য নিয়ে গবেষণা করা প্রফেসর ড. মো. সাজেদুল হক জানিয়েছেন, আগে পাওয়া গেছে বেশি, এ বছর কম পাওয়া যাচ্ছে এটি একটি গ্লোবাল প্রবলেম। জলবায়ু উষ্ণতা বা বৈশ্বিক জলবায়ু উষ্ণতার কারণেই এমনটি হচ্ছে। ইলিশ কিন্তু মাইগ্রেটরি ফিশ মানে এক জায়গা থেকে ডিম দিতে আসে আবার সেখানে চলে যায় এবং তারা যদি উপযুক্ত পরিবেশ না পায় সেখানে থাকবে না বা ডিম দেবে না। পানির লবণাক্ততা, খাবার প্লাংকটন বা পানির তাপমাত্রা বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ লবণ বেশি হলে ডিম দেবে না বা ডিম ফুটবে না, ডিম মারা যাবে। খাবার না পেলে গ্রো করবে না। তাপমাত্রা যদি অপটিমাম না হয় তাহলে বাচ্চা ফুটবে না, ডিম ফার্টিলাইজ হবে না। এই যে বিষয়গুলো, এর সঙ্গে ইলিশের জীবনচক্র সরাসরি জড়িত।

তার মতে, ‘নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, চর পড়ছে। এতে ইলিশের বংশবিস্তার বিঘ্নিত হচ্ছে এবং তারা যেখানে উপযুক্ত জায়গা পাবে সেখানেই যাবে। হয়তো এখন দেখা যাচ্ছে যে, এটা ধীরে ধীরে সাগরের ভেতরের দিকে শিফট করছে। ইন্টারন্যাশনাল এরিয়া বা ভারতের কাছাকাছি। এটাকে বলে পপুলেশন ডিনামিকস।’

ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান মনে করেন, যে পথ ধরে ইলিশ সাগর থেকে নদীতে আসে, সেই পথগুলো বিলুপ্ত হচ্ছে। চর, ডুবোচর, সিল্টেশন, বালু উত্তোলন এর বড় কারণ। ফলে  সমুদ্রেই নতুন আশ্রয়স্থল খুঁজে নিচ্ছে ইলিশ। এমন আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দীর মতে, ‘কলকারখানার দূষণ, তারপর পলিথিনের দূষণ। এ দূষণের কারণেও ইলিশসহ অন্যান্য প্রজাতির সব মাছই কিন্তু  উপকূলবর্তী থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে।’

বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হতো বাংলাদেশে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইলিশ রপ্তানি ছিল আয়ের অন্যতম উৎস। অথচ সম্প্রতি দেশের বাজার সামাল দিতে ভারতের গুজরাট থেকে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ আমদানির নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। দেশটির গণমাধ্যম বলছে, গত কয়েক মাসে পেট্রাপোল স্থলবন্দর থেকে টনকে টন গুজরাটি ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

৪০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরায় নিয়োজিত কুয়াকাটার ইউসুফ মাঝির মতে, ‘যারা আমাদের ইলিশের জন্য অধীর আগ্রহে থাকত, এমনকি পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজায় খাবারের বিশেষ তালিকায় থাকত আমাদের ইলিশ; অথচ আজ সেই দেশ থেকে ইলিশ আসছে আমাদের দেশে। যতটুকু জানতে পেরেছি, ওই ইলিশে অতটা স্বাদ নেই। যদিও মাছগুলো আরব সাগরের। তারপরও কথা হলো, গত কয়েক বছর ধরে সেখানে (গুজরাট) ইলিশের বিচরণ খুব বেশি।’

তার মতে, ‘গবেষকদের ধারণা সঠিক, গভীর সাগরে কিন্তু মাছ আছে তবে সেটা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এরিয়া। ওখানে গিয়ে আমাদের মাছ ধরা সম্ভব নয়। তবে ইলিশ যে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।’

প্রাকৃতিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের তৈরি অপকর্ম ইলিশের বংশবৃদ্ধিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে। স্থানীয় জেলে, ট্রলার মালিক ও আড়তদারদের আঙুল মূলত অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ মাছ শিকারের দিকে। সাগরে অবৈধ ট্রলিং বোটের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। ট্রলিং মূলত একটি অপেক্ষাকৃত বড় সাইজের কাঠের তৈরি বোট, যা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এই বোটে অবৈধ বেহুন্দি জাল বেঁধে সেই ইঞ্জিনের মাধ্যমে সাগরে ফেলে টানা কয়েক ঘণ্টা ধরে মাছ ধরা হয়। ট্রলিংয়ের বেহুন্দি জালে বড় মাছের সঙ্গে ছোট আকারের সব ধরনের মাছের পোনা ও জাটকা ধরা পড়ে। এতে ধ্বংস হচ্ছে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের মূল প্রজননক্ষেত্র।

রাঙ্গাবালী উপজেলার ইউসুফ মাঝি বললেন, ‘নান্দু নামে একটা জাল আছে। মাছ তো দূরের কথা, পোকামাকড় পর্যন্ত এদের জালে মারা যায়। মাছের যদি প্রজনন না বাড়ে তাহলে আমরা পাবইবা কী? আর ধরবইবা কী?’

পটুয়াখালীর মহিপুর থানা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আফজাল মোল্লা বলেছেন, ‘কুয়াকাটা, আলিপুর, মহিপুর, রাঙ্গাবালী এবং পাথরঘাটার জেলেরা মাছ পাচ্ছেন না শুধু এই অবৈধ ট্রলিং বোটের কারণে। এটি দ্বারা জেলেদের খুব ক্ষতি হচ্ছে। জেলেরা যেখানে মাছ ধরবে, সেখানেই এ ট্রলিংগুলো অহরহ জাল টানে। এরা ৪০-৫০ ব্যারেল তেল নিয়ে সাগরে গিয়ে একাধারে রাত-দিন ২৪ ঘণ্টায় ওই এরিয়ায় গিয়ে গুঁড়ি মাছগুলো ধরে। যেখানে ঝাটকা, তারপর বিভিন্ন প্রজাতির মাছের বাচ্চা থাকে। এ মাছগুলো থাকে গভীর সমুদ্র থেকে একটু ওপর দিকে। এই ওপর দিকেই ট্রলিংগুলোর বেশি আনাগোনা। সাধারণ জেলেরা এদের জ্বালায় জাল পাততে পারছে না। জাল ছিঁড়ে ফেলে দেয়।’

এই ব্যবসায়ী নেতার দাবি, ‘এখানকার একদল অসাধু ব্যবসায়ী এই অবৈধ ট্রলিং ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এসব ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম, ভোলা, বাঁশখালীর ট্রলার মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে এ অঞ্চলে ওই বোট দিয়ে মাছ শিকার করাচ্ছে। কারণ চট্টগ্রাম, ভোলা, বাঁশখালী অঞ্চলে কোস্ট গার্ডের চাপে তারা সেখানে মাছ শিকার করতে পারছে না এই ট্রলিং বোট দিয়ে।’

আগামী মাসে শুরু হতে যাচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এ সময় মা ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য উপকূল ও নদীর দিকে আসবে। তবে কঠোর নজরদারি না থাকলে নিষেধাজ্ঞা শুধু কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ হলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, ‘অবৈধ জাল যেগুলোর দ্বারা ইলিশের জাটকাসহ ছোট অন্যান্য মাছ ধরা হয়, এগুলো যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে অচিরেই শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য মাছের যে গোলাঘর, তা নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।’



জ/রা




  বিষয়:   পটুয়াখালী  ইলিশ  মৎস্য অধিদপ্তর 



Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]