জিন্নাহর ছবি টাঙানোকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। একদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘ নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শন, অন্যদিকে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর হাতে সেই ছবি ছিঁড়ে ফেলা। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একই স্থানে টাঙানো হলো জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটার ছবি। ঘটনাপ্রবাহে তীব্র বিতর্কের মধ্যে এবার নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তিনটি পৃথক ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
গতকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ অবস্থানের পর জানা গেছে, জিন্নাহ ও আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি তদন্তে সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন ছাড়া শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও পৃথক তদন্ত হবে।
গত রোববার সংস্কারের পর ডাকসু সংগ্রহশালা পুনরায় চালু করা হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গৌরবোজ্জ্বল একক ছবি না থাকলেও নতুন করে জিন্নাহর তিনটি ছবি প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া জিন্নাহর সেই বক্তব্যের ছবিও ছিল, যেখানে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন। এ ছাড়া ১৯৪০ সালের লাহোর সম্মেলনের ছবি এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে জিন্নাহর ছবি-সংবলিত সংবাদপত্রের কাটিংও রাখা হয়।
এ নিয়েই গতকাল সোমবার দুপুরে সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর একটি ছবির ফ্রেম ভেঙে ছবি ছিঁড়ে ফেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। তাঁর প্রশ্ন-ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একজন ব্যক্তির ছবি ডাকসু সংগ্রহশালায় কেন থাকবে?
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়। বিকেলে ছাত্র ফেডারেশনের নেতাকর্মীরা জিন্নাহর ছবি সরানো স্থানে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে গোলাম আযমকে জুতাপেটার একটি ছবি টাঙিয়ে দেন। সংগঠনটির বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়া বলেন, ডাকসুর একজন সম্পাদক ‘ইচ্ছা হয়েছে’ বলে জিন্নাহর ছবি লাগিয়েছেন; তাঁদেরও ইচ্ছা হয়েছে, তাই তাঁরা গোলাম আযমের ছবি লাগিয়েছেন।
তবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, জিন্নাহর ছবি কোনো মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরতেই ছবিগুলো রাখা হয়েছিল। ইতিহাস গোপন করা হলে বরং জিন্নাহর পক্ষ নেওয়া হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হলেও তার সব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হতে হবে। অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা, পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা শিক্ষক মূল্যায়ন কার্যক্রম চালানোর কোনো সুযোগ নেই। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘দ্বৈত প্রশাসন’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হলে তা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে।
উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, এসব কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি আগে থেকে অবগত ছিলেন না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জিন্নাহর ছবি নিয়ে বিতর্ক থেকে শুরু হয়ে ছবি ছেঁড়া, গোলাম আযমের ছবি টাঙানো এবং প্রশাসনের তদন্ত-সব মিলিয়ে ডাকসুর কর্মকাণ্ড এখন নতুন করে প্রশ্নের মুখে।
জ/বা