কুড়িগ্রামে আমন মৌসুমে সার সংকটকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়ছে। পর্যাপ্ত সার না পাওয়ার অভিযোগে জেলার ভূরুঙ্গামারীর পাইকেরছড়া ও বলদিয়া, নাগেশ্বরীর কচাকাটা এবং রৌমারীতে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও ডিলার পয়েন্টে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
সর্বশেষ সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ভূরুঙ্গামারী উপজেলার পাইকেরছড়া ইউনিয়নে সার না পাওয়ার অভিযোগে কৃষকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের মিলনিবাজারেও সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকেরা। পরে প্রশাসন ও পুলিশের উপস্থিতিতে সার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।
অন্যদিকে একই দিন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রৌমারীর বন্দবেড় ইউনিয়নে মতিউর রহমানের মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজ নামের সার ডিলার পয়েন্টে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, কৃষকেরা ভোররাত থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সার না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়ে এ ঘটনা ঘটান। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, গুদাম থেকে এক থেকে দেড়শ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সার নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
বলদিয়া ইউনিয়নের মিলনবাজারে ৪০০ বস্তা সার বরাদ্দ দেওয়া হলেও কৃষকের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি বলে জানান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেক। তিনি জানান, পরিস্থিতি দেখে ডিলার আতঙ্কিত হয়ে পড়লে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত থেকে সার বিতরণ করা হয়। কৃষকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করে আরও ২০ টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা পরবর্তী সময়ে বিতরণ করা হবে।
একই দিন ৬ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে সার নিতে সকাল থেকেই কৃষকদের ভিড় জমে। ডিলার পয়েন্টের লোকজন সময়মতো না আসায় একপর্যায়ে হট্টগোল ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। এতে ডিলার পয়েন্টের টিনের বেড়া ভেঙে যায়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং প্রশাসনের উপস্থিতিতে সার বিতরণ করা হয়।
এ ঘটনায় কচাকাটা থানার ওসি অর্পণ কুমার বলেন, দোকানঘরে সরাসরি ভাঙচুর হয়নি। দেড় থেকে দুই শতাধিক মানুষের ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কির কারণে বেড়ার টিন ভেঙে যায়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, সবাই একসঙ্গে সার চাইলে তা দেওয়া সম্ভব নয়। পরে ওসির উপস্থিতিতে সার বিতরণ করা হয়েছে।
এর আগে ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ি ইউনিয়নে সার না পেয়ে এক ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে প্রায় ১৯৭ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান কৃষকেরা। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে ৩৩ জন কৃষক ৩৩ বস্তা সার ফেরত দেন এবং বাকিগুলো উদ্ধারে প্রশাসন চেষ্টা চালায়। এ ঘটনায় ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন জানান, উপজেলায় সারের চাহিদা প্রায় চার হাজার বস্তা, বিপরীতে বরাদ্দ মাত্র এক হাজার ৩২০ বস্তা। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম থাকায় কৃষকদের মধ্যে সার না পাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, বরাদ্দ কম থাকার পাশাপাশি কিছু ডিলার সার মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ফলে আমন মৌসুমে সময়মতো সার না পেয়ে তারা বিপাকে পড়েছেন।
পাইকেরছড়া ইউনিয়নের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, “সার নিতে এসে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। লম্বা লাইন ধরেও চাহিদামতো সার পাচ্ছি না। সময়মতো সার না পেলে আমন চাষে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।”
এদিকে ২ সেপ্টেম্বর (বুধবার) সার মজুদের অভিযোগে ভূরুঙ্গামারীতে দুই ব্যবসায়ীকে মোট চার লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত সার বরাদ্দ ও নিয়মিত বাজার তদারকির কথা জানানো হয়েছে।
কৃষকদের দাবি, দ্রুত চাহিদা অনুযায়ী সার বরাদ্দ ও সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট ও অবৈধ মজুদের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।