জ্বালানি সংকটের চিত্র বদলে দিতে পারে মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্র

জবাবদিহি ডেস্ক

দেশজুড়ে

2026-09-07T11:19:06+06:00
2026-09-07T12:42:57+06:00
বৃহস্পতিবার ● ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
১৩ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
দেশজুড়ে
জ্বালানি সংকটের চিত্র বদলে দিতে পারে মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্র
জবাবদিহি ডেস্ক
⏲ ১১:১৯ এএম | ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | সোমবার
জ্বালানি সংকটের চিত্র বদলে দিতে পারে মোবারকপুর গ্যাসক্ষেত্র
২০১৪ সালে গভীর থেকে ওঠা অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ থামিয়ে দিয়েছিল পাবনার সুজানগরের মোবারকপুরে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি না থাকায় সাড়ে চার কিলোমিটার গভীরে গিয়েই থেমে যায় খননকাজ। এক দশক পর সেই মোবারকপুরেই আবারও শুরু হয়েছে গ্যাসের সন্ধান। এবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক কারিগরি সক্ষমতা ও চীনা প্রযুক্তি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) নতুন উদ্যোগে ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে খনন করা হবে মোবারকপুর ডিপ-১ কূপ। ভূগর্ভে গ্যাসের মজুত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কূপটি সফল হলে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে। সম্ভাব্য মজুত অনুযায়ী প্রায় ২০ বছর এই কূপ থেকে গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাপেক্স।

দেশে যখন গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে চাপে ফেলছে, তখন পাবনার এই অনুসন্ধান কূপ ঘিরে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সফল হলে শুধু জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহই বাড়বে না, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হবে উত্তরাঞ্চলে।

‌‘গত ২৭ জুলাই থেকে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন, পাইলিং ও নিরাপত্তাদেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চীনা প্রতিষ্ঠানটি কূপ খননের কাজ শুরু করবে’ - বাপেক্সের উপসহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম। 

বাপেক্স কর্মকর্তা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাবনার সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলার সীমান্তবর্তী মোবারকপুর এলাকায় কয়েক দশক আগেই প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। ১৯৮০-৮১ সালে পেট্রোবাংলা প্রথম সেখানে জরিপ চালায়। এরপর ১৯৮৩-৮৪ সালে একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান এবং ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে বাপেক্স আরও কয়েক দফা ভূতাত্ত্বিক জরিপ করে।

এসব জরিপে এলাকায় গ্যাসের সম্ভাবনার তথ্য পাওয়া যায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে মোবারকপুরে অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেয় বাপেক্স। সাড়ে চার কিলোমিটার গভীরে যাওয়ার পর ভূগর্ভের অতিরিক্ত গ্যাসের চাপের মুখে পড়ে খননকাজ। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও কারিগরি সক্ষমতার অভাবে শেষ পর্যন্ত কাজ স্থগিত করতে হয়।

সেই ব্যর্থতার পরও অবশ্য সম্ভাবনার জায়গাটি পুরোপুরি বাদ দেয়নি বাপেক্স। নতুন প্রযুক্তির সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে এবার আবারও সেখানে অনুসন্ধানে নেমেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি।

‘২০১৪ সালে নির্দিষ্ট গভীরতায় যাওয়ার পর ভূগর্ভের তীব্র চাপের কারণে খননকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সেই চাপ মোকাবিলা করে আরও গভীরে যাওয়ার মতো প্রযুক্তি তখন দেশের হাতে ছিল না। তবে এবার উন্নত আন্তর্জাতিক কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথম দফায় সফলতা না এলেও এবার আশানুরূপ ফল পাওয়ার এবং গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে’ - পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব

জানা গেছে, দেশের তিনটি সম্ভাবনাময় এলাকায় গভীর অনুসন্ধান কূপ খননের জন্য ১ হাজার ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এর আওতায় পাবনার মোবারকপুর ডিপ-১, কুমিল্লার শ্রীকাইল ডিপ-১ এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ সাউথ-১ কূপ খনন করা হবে। প্রকল্পে সরকারের ঋণ হিসেবে ৯০৯ কোটি টাকা এবং বাপেক্সের নিজস্ব অর্থায়ন ২২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা রয়েছে।

প্রকল্প সূত্রে আরো জানা যায়, মোবারকপুর ডিপ-১ কূপের আগের অনুসন্ধানস্থল ও পরিত্যক্ত কূপ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নতুন করে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। এবার ৬ কিলোমিটারের বেশি গভীরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভূগর্ভের উচ্চ চাপ মোকাবিলা করে এত গভীরে খননের জন্য আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’ (সিসিডিসি)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে বাপেক্স। চীনা প্রতিষ্ঠানটি রিগ ফাউন্ডেশন নির্মাণ ও মূল ড্রিলিংয়ের কাজ করবে।

গ্যাস মিললে বদলাতে পারে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি শুধু গ্যাস উত্তোলন নয়, মোবারকপুরের সম্ভাব্য সাফল্যকে উত্তরাঞ্চলের শিল্পায়নের সঙ্গেও দেখছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্টদের মতে, কূপটি সফল হলে আশপাশে পর্যায়ক্রমে আরও অনুসন্ধান কূপ খননের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান এবং নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

‘আশির দশক থেকেই এ এলাকায় গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে জরিপ হয়েছে। ২০১৪ সালে কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা স্থগিত হয়ে যায়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর এবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। কূপটি সফল হলে শুধু এ অঞ্চল নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। 

সুজানগরের সরকারি ডা. জহুরুল কামাল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুল মজিদ বলেন, আশির দশক থেকেই এ এলাকায় গ্যাসের সম্ভাবনা নিয়ে জরিপ হয়েছে। ২০১৪ সালে কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে তা স্থগিত হয়ে যায়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের পর এবার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, কূপটি সফল হলে শুধু এ অঞ্চল নয়, পুরো উত্তরবঙ্গের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের মার্চে ওই এলাকার ছয় একর জমি হুকুম দখল করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাপেক্সের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ চলছে।

তিনি বলেন, গ্যাস কূপ খনন সফল হলে উত্তরবঙ্গের জন্য এটি যুগান্তকারী বিষয় হতে পারে। গ্যাসের সংকট কমার পাশাপাশি নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার এবং বড় পরিসরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, ২০১৪ সালে নির্দিষ্ট গভীরতায় যাওয়ার পর ভূগর্ভের তীব্র চাপের কারণে খননকাজ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সেই চাপ মোকাবিলা করে আরও গভীরে যাওয়ার মতো প্রযুক্তি তখন দেশের হাতে ছিল না।

তবে এবার উন্নত আন্তর্জাতিক কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম দফায় সফলতা না এলেও এবার আশানুরূপ ফল পাওয়ার এবং গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে চীনা প্রতিষ্ঠানটি কুমিল্লায় কাজ করছে। সেখান থেকে রিগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাবনায় আনা হবে। তার আগে মোবারকপুরে কূপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত করা হচ্ছে।

বাপেক্সের উপসহকারী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, গত ২৭ জুলাই থেকে প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন, পাইলিং ও নিরাপত্তাদেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এসব কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চীনা প্রতিষ্ঠানটি কূপ খননের কাজ শুরু করবে।

মোবারকপুর ডিপ-১ প্রকল্পের পরিচালক ও বাপেক্সের উপমহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) এস এ এম মেরাজুল আলম জানান, সব প্রস্তুতি শেষ করে ২০২৮ সালের জুনের মাঝামাঝি সময়ে কূপটির মূল ড্রিলিং শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০২৮ সালের শেষ দিকে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলন শুরু করা সম্ভব হতে পারে।


জ/রা


  বিষয়:   পাবনা  গ্যাস  জ্বালানি  অর্থনীতি  চীন  বিশেষ-প্রতিবেদন 


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত