দেশে উৎপাদিত ভ্যাকসিন বিদেশে রপ্তানির পথে বড় বাধা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতার ঘাটতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ম্যাচিউরিটি লেভেল-৩ (এমএল-৩) অর্জনে ১৫টি ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ঘাটতি পূরণে আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ছয় মাসের মধ্যে এমএল-৩ অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি হবে। প্রস্তুতি শেষ করে ভ্যাকসিন রপ্তানির উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন।
গত ২০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঔষধ শিল্প সমিতি ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের (ডিজিডিএ) কর্মকর্তাদের বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দারকে প্রধান করে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং টুল অনুযায়ী, এমএল-৩ অর্জনের জন্য জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওষুধ ও টিকার নিবন্ধন ও বাজারজাত অনুমোদন, উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সিং ও পরিদর্শন, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, টিকার ব্যাচ ছাড়পত্র নেওয়া, বাজার-পরবর্তী নজরদারি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর সক্ষমতা থাকতে হবে। এর সঙ্গে প্রয়োজন দক্ষ জনবল, মানসম্মত নথি ও কার্যপদ্ধতি, তথ্য ব্যবস্থাপনা, নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা, জরুরি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিতের ব্যবস্থা। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে টিকা উৎপাদন ২০১১ সালে শুরু হলেও এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে ইনসে্পটা, পপুলার ও হেলথকেয়ার এই তিন কোম্পানি মানব ও পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত ১৫ থেকে ১৬ ধরনের টিকা উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ইনসে্পটা সীমিত পরিসরে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে টিকা রপ্তানি করছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমএল-৩ সনদ না থাকায় বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিসরে প্রবেশ করতে পারছে না।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার সমকালকে বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশ ডব্লিউএইচওর ম্যাচিউরিটি লেভেল-২ পর্যায়ে রয়েছে। এমএল-৩ অর্জনের জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে আমাকে টাস্কফোর্সের প্রধান পৃষ্ঠপোষক করা হয়েছে। এমএল-৩ অর্জনের জন্য কর্মপরিকল্পনা দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রণয়নের কাজ শেষ হবে। এর পর ছয় মাসের মধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। বাস্তবায়ন শেষে ডব্লিউএইচওকে মূল্যায়নের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে।’
২০১৬ সাল থেকে এমএল-৩ অর্জনে কাজ করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এটি করতে আইন করা জরুরি ছিল। তিন বছর আগে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন-২০২৩ হলেও এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রস্তুত করতে পারেনি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। পাশাপাশি ডিজিডিএর সংশোধিত সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন জরুরি হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান সমকালকে বলেন, আগামী বছরের মধ্যে দেশে উৎপাদিত ভ্যাকসিন রপ্তানির উপযোগী করতে একটি রোডম্যাপ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। রপ্তানির পথে ১৫টি বড় বাধা রয়েছে। সেগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। আগামী বছর ডব্লিউএইচওর প্রধান মূল্যায়ন হওয়ার কথা। আইন, জনবল, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রস্তুতি চলছে। এমএল-৩ অর্জনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রতিটি লক্ষ্যের জন্য সময়সীমা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির সময়ও ঠিক করা হয়েছে। ঢাকায় ডব্লিউএইচওর কর্মকর্তা এ কাজে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এমএল-৩ অর্জন শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে হবে। দেশে বর্তমানে তিনটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন উৎপাদন করছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের এক বা একাধিক কারখানা পরিদর্শন করতে পারে ডব্লিউএইচওর মূল্যায়নকারী দল। আগের পরিদর্শনে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছিল।
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের কাছ থেকে প্রায় ১২ কোটি মার্কিন ডলারের ভ্যাকসিন কিনেছে। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণ ও নতুন টিকা যুক্ত হলে ২০৩০ সালে এই ব্যয় প্রায় ৪০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ১৫০টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করে। ডব্লিউএইচওর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ওষুধ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। তবে ভ্যাকসিন রপ্তানির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সক্ষমতা অর্জন জরুরি।
বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘ডব্লিউএইচওর ম্যাচুরিটি লেভেল-৩ অর্জনে শুধু গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (জিএমপি) মানলেই হবে না; কারেন্ট গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিস (সিজিএমপি) অনুযায়ী উৎপাদনব্যবস্থা নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসব কাজ এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, সক্ষমতা অর্জনে ওষুধের মান নিশ্চিত করতে পরীক্ষার পরিমাণ বেড়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুই দশক আগে একটি ওষুধে কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে ১৮ থেকে ২০ ধরনের অমিশ্রণ পরীক্ষা করতে হয়। এসব পরীক্ষার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। বাজারজাতের পরও নমুনা দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করতে হয় এবং তা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী সমকালকে বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক মানের টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমএল-৩ অর্জনের প্রচেষ্টাও চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা শিগগির ঢাকায় আসবেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে। এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জে সরকারিভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হলে কাজ আরও দ্রুত এগোবে।
জ/রা