হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকটে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ যখন ঝুঁকির মুখে, তখন বিকল্প পথে তেল রপ্তানির জন্য পুরোনো পাইপলাইনগুলো পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে ইরাক। এর মধ্যে ৮৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন পুনরায় চালুর পরিকল্পনাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে ইরাকের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের পর শক্তি, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারের বিভিন্ন সমঝোতা ও চুক্তি হয়। এর মধ্যে ইরাকের তেল খাতকে ঘিরে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ রয়েছে। তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম বারাক মন্তব্য করেছেন, কিরকুক-বানিয়াস প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব রাজনীতিতে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেকটাই কমে যেতে পারে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রায় ২০ বছরের উপস্থিতির পর ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে শেষ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা রয়েছে। এ সময়েই মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ইরাকের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজের বিকল্প রুট তৈরি এবং ইরাকের তেল খাত পুনরুদ্ধারে ইরাক-সিরিয়া যৌথ উদ্যোগে কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনাকে ওয়াশিংটন সমর্থন করছে।
প্রকল্পটির সংস্কারকাজ মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনের নেতৃত্বে করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে একটি যৌথ বিনিয়োগকারী কনসোর্টিয়াম সম্ভাব্যতা ও অর্থায়নের কাঠামো নিয়ে কাজ করছে এবং ইরাক-সিরিয়া যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ আন্তঃসরকারি পরিচালনব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
১৯৫২ সালে নির্মিত কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন দিয়ে সিরিয়ার বানিয়াস বন্দরে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হতো। ১৯৮২ সালে ইরাক ও সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাথ পার্টির রাজনৈতিক বিরোধের কারণে এটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০০ সালে অল্প সময়ের জন্য চালু হলেও ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের সময় বিমান হামলায় পাইপলাইনটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর প্রায় দুই দশক ধরে এটি অকার্যকর।
তবে সিরিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রকল্পটির অন্যতম বড় ঝুঁকি। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সুওয়েদা প্রদেশে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র দ্রুজ গোষ্ঠীগুলোর সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। জাতিসংঘের উপ-বিশেষ দূত ক্লদিও কর্ডোনও নিরাপত্তা পরিষদকে জানিয়েছিলেন, দ্রুজ সম্প্রদায়কে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার আন্তর্জাতিক রোডম্যাপ বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এর আগেও পাইপলাইনটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৯ সালে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালেকি রুশ কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা করে এটি সংস্কারের চেষ্টা করেন। ২০১১ সালে সিরিয়ার তেল মন্ত্রণালয় ইরাকের সঙ্গে নতুন তিনটি পাইপলাইন নির্মাণের ঘোষণা দিলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রকল্পের আরেকটি বড় বিষয় ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার ও কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের (কেআরজি) সম্পর্ক। জ্বালানি বিশ্লেষক সিরিল উইডারশোভেনের মতে, রাজনৈতিক বিভাজন যে সরাসরি রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়, বাগদাদ তা বুঝতে পারছে। তবে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক জন ক্যালাব্রেস মনে করেন, দুই পক্ষের বিরোধ এখনো স্পষ্ট। গত মার্চে বাগদাদ পেট্রোডলার স্থানান্তরে নিষেধাজ্ঞা দিলে ইরবিল কিরকুক-জেহান পাইপলাইনে তেল সরবরাহ বন্ধ করে নিজেদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করে।
হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইরাক তুরস্কের পথেও তেল রপ্তানি বাড়াচ্ছে। ১৯৭৬ সালে নির্মিত ৯৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ কিরকুক-জেহান পাইপলাইনের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল। বিভিন্ন যুদ্ধ ও বিরোধে কয়েকবার এটি বাধাগ্রস্ত হলেও ২০২৩ সালে সালিসি বিরোধে দুই বছর বন্ধ থাকার পর গত ১ আগস্ট আঙ্কারা ও বাগদাদ এক বছরের চুক্তি নবায়ন করেছে। বর্তমানে পাইপলাইনটি সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যবহার করছে এবং দক্ষিণ ইরাকের তেলক্ষেত্র পর্যন্ত সম্প্রসারণের আলোচনা চলছে।
ইরাকের তেল খাত আধুনিকায়নেও বেশ কিছু বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। টোটালএনার্জিসের ২৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি, বিপির চারটি উত্তরাঞ্চলীয় তেলক্ষেত্র সংস্কার এবং চীনের সহায়তায় আল-ফাও শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এসব প্রকল্পের কিছু কাজ বিলম্বিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে পাইপলাইনগুলো হরমুজ-নির্ভরতা কমাতে কৌশলগত ভূমিকা রাখতে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা।
কিরকুক-বানিয়াস পাইপলাইন পুনর্নির্মাণে প্রায় চার বছর সময় এবং আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে হরমুজ সংকটের সমাধান না করলেও প্রকল্পটি আগামী ২৫ বছরের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া দক্ষিণ ইরাকের তেলক্ষেত্র থেকে জর্ডানের আকাবা বন্দর পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগও এগোচ্ছে। প্রথম ধাপে বাসরা-হাদিসা অংশের কাজ শুরু হয়েছে এবং এর দৈনিক সক্ষমতা হবে ২৫ লাখ ব্যারেল। পাশাপাশি সিরিয়া হয়ে লেবাননের ত্রিপোলি বন্দর পর্যন্ত ৯২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কিরকুক-ত্রিপোলি পাইপলাইন এবং ১৯৪৮ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া কিরকুক-হাইফা পাইপলাইনের সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে ইরাক একাধিক বিকল্প তেল পরিবহনপথ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। তবে এসব প্রকল্পের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সমঝোতা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর। সূত্র: আরব নিউজ
জ/উ