মোংলা বন্দরে ‘ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তিন থেকে চারটি বড় খণ্ডে কেটে আনা চারটি বিলাসবহুল গাড়ির চালান শনাক্ত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। কাস্টমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, খণ্ডিত অংশগুলোর সঙ্গে গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযুক্ত রয়েছে। এসব অংশ পুনরায় সংযোজন করলে গাড়িগুলোর মূল কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করা সম্ভব। আজ বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআর জানায়, চালানটি পৃথক গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও পরীক্ষায় পাওয়া অংশগুলো সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল না। বরং চারটি গাড়িকে কয়েকটি বড় অংশে কেটে আনা হয়েছে। এ কারণে চালানটি সাধারণ ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ নয়, বরং আংশিক সংযোজিত অবস্থায় মোটরযান আমদানির চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে বলে কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে।
চার গাড়ির সম্ভাব্য মূল্য ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা
কাস্টমসের শনাক্ত করা চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি। অথচ পুরো চালানটি ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে ঘোষণা করে ইনভয়েস মূল্য দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার।
চালানটির শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা। এর ওপর শুল্ক-করসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর জানায়, চালানটির বিল অব এন্ট্রি নম্বর সি-৬৯০৪। আমদানিকারক ঢাকার গেন্ডারিয়ার ক্রাউন অটো মোবাইল সার্ভিসেস এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট খুলনার এসটি ইন্টারন্যাশনাল। জাপানের মাহি কার পোর্ট থেকে চালানটি আনা হয়।
চালানটিতে ১৪ ধরনের পণ্যের মোট ১৬৪টি প্যাকেজ ছিল। ঘোষিত পণ্যের মধ্যে ব্যবহৃত দরজা, ২০০০ সিসি পেট্রোল ইঞ্জিনসহ গিয়ার অ্যাসেম্বল, সাসপেনশন শক অ্যাবসরবার, নোজ কাট, হেড লাইট, টেইল লাইট, ফেন্ডার, কেবিন, স্টিয়ারিং হুইল ও বাম্পারসহ বিভিন্ন গাড়ির যন্ত্রাংশ রয়েছে।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরীক্ষা
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় ও মোংলা সার্কেল চালানটির খালাস কার্যক্রম স্থগিত করে। পরে গত ১৯ জুলাই চালানটির শতভাগ কায়িক পরীক্ষা করা হয়।
পরীক্ষার সময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) বিশেষজ্ঞদের কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়। গাড়ির বিভিন্ন অংশে থাকা স্টিকার, লেবেল, চিহ্ন ও নম্বর বিশ্লেষণের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তায় গাড়িগুলোর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পরীক্ষায় ঘোষিত আলাদা গাড়ির যন্ত্রাংশের বিপরীতে বৈদ্যুতিক তারের সংযোগ ব্যবস্থা, সংবেদক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সংযুক্ত অবস্থায় সামনের কাটা অংশ, সম্পূর্ণ পেছনের কাটা অংশ, সামনের ও পেছনের অংশ কাটা এবং ছাদ কাটা প্যানেল অ্যাসেম্বল পাওয়া যায়।
কাস্টমস গোয়েন্দার অনুসন্ধানে উঠে আসে, গাড়িগুলো সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের মতো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা হয়নি। বরং কয়েকটি বড় অংশে কেটে সেগুলো আমদানি করা হয়েছে।
যেসব গাড়ি শনাক্ত
শনাক্ত চারটি গাড়ির মধ্যে রয়েছে ২০১৭ মডেলের রেঞ্জ রোভার ভোগ, ২০১০ মডেলের বিএমডব্লিউ ৬৫০ আই, ২০১৬ মডেলের লেক্সাস এলএক্স৫৭০ এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেট।
কাস্টমসের ধারণা অনুযায়ী, রেঞ্জ রোভারের বাংলাদেশি বাজারমূল্য প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, বিএমডব্লিউ ৬৫০ আইয়ের ৬০ থেকে ৯০ লাখ টাকা, লেক্সাস এলএক্স৫৭০-এর ২ কোটি থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি এবং টয়োটা ক্রাউন অ্যাথলেটের ৩০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা।
এনবিআর জানিয়েছে, চারটি গাড়ির সম্ভাব্য বাজারমূল্য আনুমানিক ৪ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। তবে এটি আনুমানিক বাজারমূল্য। চূড়ান্ত মূল্যায়ন ও শুল্ক-কর নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শুল্কায়নের মাধ্যমে হবে।
রাজস্ব ফাঁকি কত, নির্ধারণ চলছে
চালানটির ইনভয়েস মূল্য ৭ হাজার ৯৩৫ মার্কিন ডলার। ঘোষণায় প্রতি ডলারের বিনিময় হার ১২২.৭৪৩৩ টাকা এবং অন্যান্য ব্যয় ১৯ হাজার ৫৭৭ টাকা ধরে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় প্রায় ৯ লাখ ৯৩ হাজার ৫৪৭ টাকা।
এর ওপর শুল্ক-কর দেখানো হয় ৬ লাখ ৭ হাজার ৩৯৬ টাকা এবং অন্যান্য অর্থসহ মোট পরিশোধযোগ্য অর্থ ৬ লাখ ১০ হাজার ৩০ টাকা।
তবে গাড়িগুলোকে পৃথক ব্যবহৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ হিসেবে না দেখে জিআরআই আইন অনুযায়ী আংশিক সংযোজিত অবস্থায় সম্পূর্ণ মোটরযান হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হলে কী পরিমাণ শুল্ক-কর প্রযোজ্য হতো, তা এখন নির্ধারণ করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে গাড়ির প্রকৃত মূল্য, ইঞ্জিনের ক্ষমতা, বয়স, অবচয় ও প্রযোজ্য শুল্ক-করসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রাজস্ব ফাঁকির প্রকৃত পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে।
এনবিআর বলছে, আইন অনুযায়ী কোনো পণ্য অসম্পূর্ণ, অসমাপ্ত বা খণ্ডিত অবস্থায় থাকলেও তাতে যদি সম্পূর্ণ পণ্যের ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেটিকে সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়।
পরীক্ষায় পাওয়া অংশগুলোর ধরন ও বিন্যাস বিবেচনায় এসব গাড়ির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মোটরযানের ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বিদ্যমান রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
জ/উ