কুমিল্লা অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দিন দিন কমছে ছেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অনেক প্রতিষ্ঠানে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কোথাও মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৭০ শতাংশই মেয়ে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ বছরে ছেলে শিক্ষার্থীর হার আরও কমতে পারে।
শিক্ষাবিদদের মতে, দারিদ্র্য, পারিবারিক সংকট, লেখাপড়ায় অমনোযোগিতা এবং অল্প বয়সে কর্মজীবনে যুক্ত হয়ে পড়ার কারণে অনেক ছেলে শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যেও ছেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০২২ সালে উত্তীর্ণদের মধ্যে ছেলে ছিল ৭৩ হাজার ৯৯৩ জন, আর মেয়ে ৯৬ হাজার ৪৯১ জন। ২০২৩ সালে ছেলে ৬০ হাজার ৭৪৭ এবং মেয়ে ৮২ হাজার ৪৬৯ জন, ২০২৪ সালে ছেলে ৫৮ হাজার ৭৮২ ও মেয়ে ৮৩ হাজার ২৯৯ জন।
২০২৫ সালে উত্তীর্ণ ছেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে দাঁড়ায় ৪৩ হাজার ৪৮০ জনে। বিপরীতে মেয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৬২ হাজার ৮০১ জন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে ছেলে উত্তীর্ণ হয়েছে ৩৭ হাজার ২০৩ জন এবং মেয়ে ৫৮ হাজার ১৯৬ জন। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে ছেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে।
সরেজমিন কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার তপইয়া ময়ুরেন্নছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চম শ্রেণিতে মোট ১৯ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছেলে মাত্র তিনজন। একই উপজেলার উত্তরদা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির একটি শাখায় ৩৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছেলের সংখ্যা পাঁচজন। কুমিল্লা নগরীর আইডিয়াল কলেজেও ছেলে শিক্ষার্থীর হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে তাদের সঙ্গে পড়া অনেক ছেলে এখন আর বিদ্যালয়ে আসে না। তাদের কেউ চায়ের দোকানে, কেউ ফার্নিচার কিংবা কাচের দোকানে কাজ করছে। আবার কেউ কেউ মাদকের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে কাজে যোগ দিয়েছে বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।
উত্তরদা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক মাসুদুল হক বলেন, ‘আমাদের এলাকায় মেয়েদের তুলনায় ছেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত কমছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী ১০ বছরে ছেলে শিক্ষার্থীর হার আরও কমে যেতে পারে। অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি ছেলেদের শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে কর্মমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘দারিদ্র্য, সামাজিক অবক্ষয় ও লেখাপড়ায় অমনোযোগিতায় ছেলেরা পিছিয়ে পড়ছে। আমাদের ৮৭৫ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬০০-এর বেশি মেয়ে। অনেক অভিভাবক ছেলেদের অটোরিকশা চালানো বা রাজমিস্ত্রির কাজে যুক্ত করে দেন। আবার বয়স বাড়িয়ে বিদেশেও পাঠান। প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার অভাবে অনেকে পরে ফিরে আসেন।’
লালমাই উপজেলার মুক্তবাংলা কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য আবদুল হালিম মজুমদার বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানেও মোট শিক্ষার্থীর প্রায় তিন ভাগের দুই ভাগ মেয়ে। অনেক ছেলে কিশোর গ্যাং ও মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কারণে শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
কুমিল্লা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ মহিউদ্দিন লিটন বলেন, ‘দিন দিন ছেলে শিক্ষার্থীর হার কমছে। ছেলেদের স্কুলমুখী করতে সরকারকে উৎসাহমূলক প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে।’
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আহসান পারভেজ বলেন, ‘ইদানীং উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ছেলে শিক্ষার্থীর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় ছেলেদের অল্প বয়সেই পরিবারের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। আবার অনেকের যাতায়াতের খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই।’
তিনি বলেন, ‘এ সমস্যা থেকে উত্তরণে জাতীয় পর্যায়ে ভাবতে হবে। ছেলে শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি ও মেধাবৃত্তির পরিমাণ বাড়িয়ে তাদের শিক্ষায় উৎসাহিত করতে হবে।’
জ/উ