‘সন্ত্রাস, মাদক, ধর্ষণ ও অপরাধমুক্ত খুলনা জেলা’ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন খুলনার নবাগত পুলিশ সুপার (এসপি) সরকার ওমর ফারুক। দায়িত্ব নেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রথম মতবিনিময় সভায় তিনি স্পষ্ট করেছেন-অপরাধ করে কেউ ছাড় পাবে না। একই সঙ্গে জেলার প্রতিটি থানাকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
তবে প্রশ্ন উঠছে, ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব কতটা? মাদক, চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সামনে রয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু পুলিশি তৎপরতা নয়, জনগণ, গণমাধ্যম, প্রশাসন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত ভূমিকার ওপরই জোর দিয়েছেন নবাগত পুলিশ সুপার। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেলে খুলনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন সরকার ওমর ফারুক।
অপরাধ করে কেউ ছাড় পাবে না’ নবাগত এসপির বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে অপরাধ দমনের বিষয়টি। তিনি বলেন, খুলনাকে সন্ত্রাস, মাদক, ধর্ষণ ও অন্যান্য অপরাধ থেকে মুক্ত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করবে। অপরাধ করে কেউ যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। সরকার ওমর ফারুকের ভাষ্য অনুযায়ী, অপরাধীদের সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কম। বিপরীতে আইন মেনে চলা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। তাই সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের একার সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছেন নবাগত পুলিশ সুপার। তাঁর মতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ, প্রশাসন, সাংবাদিক ও সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে অপরাধের তথ্য দ্রুত পুলিশের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছেন তিনি। সাংবাদিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ কাজ করতে চায় বলেও জানান তিনি।
এখানেই সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-অপরাধ সংঘটনের পর পুলিশের তৎপরতার পাশাপাশি অপরাধের আগাম তথ্য, স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোগ এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপদে আইনি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই হবে কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার অন্যতম পরীক্ষা। মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘আরও সক্রিয়’ পুলিশ খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মাদকদ্রব্য, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশনার কথা জানান এসপি।
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাও। জেলা প্রশাসন, সাংবাদিক সমাজ এবং সংশ্লিষ্ট সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এসব অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন বলে মনে করেন তিনি। অর্থাৎ নতুন পুলিশ সুপারের পরিকল্পনায় শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তার নয়; অপরাধের তথ্য সংগ্রহ, স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় এবং জনগণের সহযোগিতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
থানাকে ‘আস্থার জায়গা’ বানানোর প্রতিশ্রুতি একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান হলো থানা। কিন্তু থানায় গিয়ে মানুষ কতটা স্বস্তি নিয়ে অভিযোগ করতে পারে, কত দ্রুত প্রতিকার পায় এবং পুলিশি সেবা কতটা নিরপেক্ষভাবে পায়-এসব প্রশ্নই জনআস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। নবাগত পুলিশ সুপার জেলার প্রতিটি থানাকে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগই আগামী দিনে পুলিশের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের অন্যতম মানদণ্ড হয়ে উঠতে পারে।
ভুঁইফোড় অনলাইন সাংবাদিকতা নিয়েও উদ্বেগ মতবিনিময় সভায় অনলাইনভিত্তিক ভুঁইফোড় সাংবাদিকতার বিষয়টিও উঠে আসে। এসপি সরকার ওমর ফারুক বলেন, এটি শুধু খুলনার সমস্যা নয়; সারা দেশেই এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের সাংবাদিকতা মোকাবিলায় পুলিশ, জেলা প্রশাসন ও সাংবাদিক কমিউনিটিকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রকৃত সাংবাদিকতা এবং অপেশাদার বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন সামনে বাস্তবায়নের পরীক্ষা নবাগত পুলিশ সুপারের বক্তব্যে অপরাধমুক্ত খুলনার যে প্রত্যয় উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। কিন্তু প্রত্যয়কে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অপরাধের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা, থানায় জনবান্ধব সেবা, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং পুলিশের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে অপরাধের প্রকৃত চিত্র, মামলার অগ্রগতি এবং পুলিশের কার্যক্রমের স্বচ্ছ তথ্য জনসম্মুখে আসাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শুধু বক্তব্য দিয়ে নয়, মাঠপর্যায়ের ফলাফল দিয়েই শেষ পর্যন্ত বিচার হবে-খুলনা কতটা নিরাপদ হলো। নবাগত পুলিশ সুপার বলেছেন, অপরাধীদের তুলনায় আইন মেনে চলা মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কতটা কার্যকর পুলিশিং প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মতবিনিময় সভায় খুলনা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) আবির সিদ্দিকী শুভ্র এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এ-সার্কেল সাইফুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।