আজ মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অধিদফতরের সম্মেলন কক্ষে সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে এলএনজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, এফএসআরইউ দুর্ঘটনা এবং দেশে দীর্ঘদিনের গ্যাস ঘাটতি- সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়েছে সরকার।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এখন সরকারকে বেছে নিতে হচ্ছে- প্রায় দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হবে, নাকি স্বল্প মেয়াদে কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানা সচল রাখতে বকেয়া গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো, ভোলার গ্যাস দ্রুত ব্যবহারে আনা এবং দেশীয় উৎসে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস সরবরাহ এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। একটি এফএসআরইউতে দুর্ঘটনার পর সেটি মেরামত করা হলেও এলএনজি কার্গো সরবরাহে এখনও সমস্যা রয়েছে। নতুন কার্গো এলে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
তিনি বলেন, শিল্পকারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বকেয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে ১২ মাসের কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও গুজব দূর করতে নিয়মিত সরকারি ব্রিফিং দেওয়ারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কয়লাভিত্তিক উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ
প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে এবং শিল্পকারখানার জন্য গ্যাস সাশ্রয় করতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার যতটা সম্ভব কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ধরে রাখার চেষ্টা করছে সরকার। সে কারণেই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ভোলার নতুন গ্যাসক্ষেত্র থেকে দ্রুত গ্যাস জাতীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এ জন্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকার একটি জরুরি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, ভোলায় বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য গ্যাস রয়েছে। কীভাবে সেই গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনা হবে- পাইপলাইন, সিএনজি বা অন্য প্রযুক্তির মাধ্যমে- তা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার দ্রুত একটি কার্যকর পদ্ধতি নির্ধারণ করতে চায়।
বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতেও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। দেশীয় উৎস থেকে প্রায় ১ হাজার ৭৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্য নিয়ে প্রায় ১৫০টি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশে এখনও উল্লেখযোগ্য গ্যাসসম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বিভিন্ন জরিপে সম্ভাব্য মজুত নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান এসেছে। স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান আরও আগেই জোরদার করা প্রয়োজন ছিল।
তিনি বলেন, বর্তমান সংকটকে শুধু সাম্প্রতিক ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি বহু বছরের পুঞ্জীভূত সমস্যা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তাদের সময়েও স্থলভাগে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান খুব বেশি এগোয়নি। তবে তখন মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ধরনের সংকটও ছিল না।
বর্তমান সংকটের বড় কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, গত বছরের একই সময়ে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল আনুমানিক ১২ থেকে ১৪ ডলার। এখন তা প্রায় ২৪ ডলারে পৌঁছেছে। সামনে ৩০ ডলার বা তার বেশি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, অনেক বেশি দামে এলএনজি আমদানি করে বিপুল ভর্তুকি দেওয়া হবে, নাকি স্বল্প মেয়াদে কিছুটা লোডশেডিং মেনে নেওয়া হবে- এই সিদ্ধান্তের জায়গায় সরকারকে আসতে হচ্ছে। তবে এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখছেন না তিনি। বরং স্বল্পমেয়াদি সংকট ব্যবস্থাপনার অংশ বলেই উল্লেখ করেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলো এলএনজির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শীত সামনে রেখে ইউরোপীয় দেশগুলো গ্যাসের মজুত বাড়াচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ আরও বাড়ছে।
তিনি বলেন, সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং জনগণের কাছেও বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিবেচনার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। কাতারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ওমানসহ দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গেও নতুন করে আলোচনা চলছে।
উপদেষ্টা বলেন, অর্থমন্ত্রীও জানিয়েছেন জ্বালানি খাতকে একটি স্থিতিশীল ও সন্তোষজনক অবস্থায় নিতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
তবে তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে পুরো দুই বছর পরিস্থিতি খারাপ থাকবে। ধাপে ধাপে উন্নতি হবে বলে আশা করছে সরকার।
দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সরবরাহ এর নিচে রয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। বিশেষ করে একটি নির্বাচিত সরকারের সময়ে বিনিয়োগ বাড়লে জ্বালানির চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই আরও বাড়বে।
ব্রিফিংয়ে প্রশ্ন ওঠে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একই অবকাঠামো ও সক্ষমতা দিয়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলেও এখন কেন সংকট বেড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, তিনি ‘খুব বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত অসংগতি’ দেখছেন না।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সংকটের একটি বড় কারণ এফএসআরইউ দুর্ঘটনা। কয়েকদিনের তীব্র সংকটে এর সরাসরি প্রভাব ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি পাওয়া গেলেও দাম অনেক বেশি। আগের তুলনায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তুলনামূলকভাবে কম ছিল। ফলে জ্বালানির চাহিদাও কম ছিল। এখন নির্বাচিত সরকার আসার পর বিনিয়োগ বাড়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে এবং এর সঙ্গে জ্বালানির চাহিদার ওপর চাপও বেড়েছে।
তিনি বলেন, আমি অবশ্যই বলছি না যে ব্যবস্থাপনায় কোনও সমস্যা হয়নি। আমাদের মতো একটি দেশে কিছু অদক্ষতা বা ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতি থাকতেই পারে। আমরা সেটি স্বীকার করি। তবে বর্তমান সংকটের প্রধান কারণগুলোর একটি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানির অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য।
বিদ্যুৎ স্থাপনাগুলোতে বাড়তি নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে কি না এবং সরকার নাশকতার আশঙ্কা করছে কি না— এমন প্রশ্নও ওঠে ব্রিফিংয়ে।
জবাবে উপদেষ্টা সরাসরি কোনও নাশকতার তথ্য দেননি। তবে বিদ্যুৎ-জ্বালানি সংকট দীর্ঘ হলে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বাসাবাড়িতে লোডশেডিং হলে সাধারণ মানুষ কষ্ট পায়। শিল্পে উৎপাদন বন্ধ হলে উদ্যোক্তার ব্যাংকঋণ ও শ্রমিকের বেতন দেওয়ার চাপ তৈরি হয়। বিদ্যুৎ না থাকলে ছোট ব্যবসায়ীর আয় বন্ধ হয়। আবার সিএনজি চালকেরা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও গ্যাস না পেলে তাদের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপদেষ্টা বলেন, আমরা যতই বলি এই সংকটের সব দায় সরকারের নয়, দিনের শেষে মানুষ তো কষ্ট পাচ্ছে। মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সম্ভাব্য সব ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
জ/বা