সরবরাহ কমায় ভরা মৌসুমের দুই মাস শেষ হতে চললেও বাজারে ইলিশের দেখা মিলছে না বললেই চলে। যেটুকু মিলছে তারও গড় আকার আগের চেয়ে ছোট। বিক্রিও হচ্ছে চড়া দামে। ফলে ভরা মৌসুমেও সাধারণ মানুষের পাতে উঠছে না ইলিশ।মৎস্য বিভাগের তথ্য মতে, নদীতে নাব্যতা সংকট, দূষণ, প্রজনন ব্যাহত হওয়া ও অবাধে জাটকা নিধনে দিন দিন উৎপাদন কমছে ইলিশের। গবেষকরা জানিয়েছেন, একসময়ের ৪৫০ গ্রাম গড় ওজনের ইলিশ এখন ৩০০ গ্রামে নেমে এসেছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকেই ইলিশের প্রধান মৌসুম ধরা হয়। দেশে আহরিত মোট ইলিশের ৭০ ভাগ পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরে। তবে কয়েক বছর ধরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির হার ক্রমে নিম্নমুখী। তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন। ২০১৯-২০ সালে তা বেড়ে হয় ৫ দশমিক ৫০ লাখ টন, ২০২০-২১ সালে ৫ দশমিক ৬৫ লাখ ও ২০২১-২২ সালে হয় ৫ দশমিক ৬৬ লাখ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন বেড়ে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টনে পৌঁছায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা পাঁচ লাখ টনে নেমে এসেছে।
কেবল উৎপাদন ও সরবরাহ নয়, আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে ইলিশের দৈহিক আকারও। ইলিশ গবেষক ও বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান জবাবদিহিকে বলেন, বিগত দুই বছর ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন কমছে, শুধু তা-ই নয় ইলিশের আকারও ছোট হয়েছে। একটা সময় ইলিশের গড় ওজন ছিল ৪০০-৪৫০ গ্রাম। এখন ৩০০-৩৫০ গ্রামে নেমে আসছে। তিনি বলেন, জলবায়ু সংকটে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদী দূষণ, নাব্যতা সংকট ও প্রজনন পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার কারণে এ সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণে তিনি নদী ব্যবস্থার পরিবেশ রক্ষা ও সঠিক গবেষণার ওপর জোর দেন।
খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান জানান, একটি ইলিশ এক-দেড় কেজি ওজনের হতে অন্তত দেড় বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। নদীতে ডিম ফোটার পর বাচ্চা ইলিশ সাগরে যায় এবং একটু বড় হয়ে আবার ডিম ছাড়তে মিঠাপানিতে ফিরে আসে। কিন্তু বর্তমানে অতিরিক্ত মাছ শিকারের কারণে এ জীবন চক্র পূর্ণ হতে পারছে না।
তিনি বলেন, মোহনায় নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বালি উত্তোলন, শিল্প-কারখানার দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে নদীর স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া সাগরে ট্রলিং জাহাজের মা-মাছ ও জাটকা শিকারের কারণে বড় ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। আইন অমান্যকারীদের অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান থাকলেও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার থামছে না। তবে বাজারে ছোট আকারের ইলিশের সরবরাহও কম। এছাড়া বাজারগুলোয় এ মাছ দীর্ঘদিন ধরে হিমায়িত করে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
খুলনার ময়লাপোতা সান্ধ্যবাজারে ইলিশ কিনতে আসা ব্যাংক কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে এক কেজি ইলিশ কেনার সামর্থ্য আমার নেই। বাঙালির প্রিয় ইলিশ এখন শুধু রাজাদের মাছে পরিণত হয়েছে। স্কুল শিক্ষক সৌমেন অধিকারী বলেন, মৌসুমেও যদি এত দাম হয়, তবে সাধারণ মানুষ ইলিশ খাবে কীভাবে? নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কোনো তদারকি চোখে পড়ে না।
তবে বাজারে ইলিশের এ চড়া দামের পেছনে সিন্ডিকেট ও অতিরিক্ত হাতবদলকে দায়ী করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, আহরণ থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত ইলিশ চার দফা হাত বদল হয়। এর প্রতিটি ধাপে দাম বাড়ে। পাশাপাশি দাদন, অতি মুনাফা, বরফ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ইলিশ আহরণের খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। আবার অনেক বিক্রেতা অধিক লাভের আশায় ফ্রিজিং করে বাঙ্কারে মাছ মজুদ করেন। এক বিক্রেতা জানান, সরবরাহ কম থাকায় তারা আগের বছরের মজুদ করা ‘হিম ইলিশ’ বিক্রি করছেন। বর্তমানে বাজারে জাটকা বা ৩০০-৪০০ গ্রামের ছোট ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়, এক কেজি ওজনের ইলিশ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় ও দেড় কেজি ওজনের ইলিশ ৪ হাজার ৫০০ টাকায়।
তবে ফ্রিজিং করা ইলিশের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ফ্রিজিং করা ইলিশ ছয় মাস পর গুণগত ও পুষ্টিমান হারাতে শুরু করে। দীর্ঘদিন এভাবে রাখা মাছ খেলে ক্রেতাদের ফুড পয়জনিং হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। ইলিশ সংকটের স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোয়। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আওতায় সারা দেশে ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে পাঁচটি বন্ধ এবং নয়টি টেনেটুনে চলছে। খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই সরবরাহ সবচেয়ে কম। ভরা মৌসুমে চলতি জুলাই পর্যন্ত এখানে মাত্র দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে। অথচ ২০২২ সালের জুলাইয়ে এসেছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৯৭৬ ও ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৩৯১ কেজি। পাশাপাশি দেশের অন্যতম বড় মোকাম বরগুনার পাথরঘাটায়ও আমদানি কমেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রে ইলিশ রক্ষায় নিঝুম দ্বীপ, নাফ নদীসহ ছয়টি এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। সে অভয়াশ্রমগুলো কার্যকরভাবে রক্ষা করা যায়নি। এতে উৎপাদন কমেছে। তাদের মতে জাটকা ও মা-মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা গেলে ইলিশ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। এর জন্য মৎস্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও বিধিমালা, ১৯৮৫-এর সঠিক প্রয়োগ, নিষিদ্ধ ট্রলিং বন্ধ করা, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা ও জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে উপযুক্ত প্রণোদনা দেয়া জরুরি।