১৯২১ সালের ২ মে। কলকাতার গড়পাড় রোডের এক সাংস্কৃতিক পরিবারে জন্ম নিলেন এমন এক শিশু, যিনি পরবর্তী সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রকে বিশ্বদরবারে নতুন পরিচয় দেবেন। তাঁর নাম সত্যজিৎ রায়। সত্যজিতের জন্ম এমন একটি পরিবারে, যেখানে সাহিত্য, শিল্প ও সৃজনশীলতা ছিল জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা ছিলেন প্রখ্যাত কবি, শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার সুকুমার রায়। আর দাদা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন লেখক, চিত্রশিল্পী, আলোকচিত্রী ও প্রকাশক। কিন্তু সত্যজিতের বয়স যখন মাত্র আড়াই বছর, তখনই তাঁর বাবা সুকুমার রায় মারা যান। এরপর মা সুপ্রভা রায়ের কাছেই তাঁর বেড়ে ওঠা।
শৈশব থেকেই ছবি আঁকা, সংগীত ও বইয়ের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি পড়লেও তাঁর মন পড়ে থাকত শিল্প ও সৃজনশীলতার জগতে। পরে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হন। সেখানে নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীদের কাছ থেকে তিনি ভারতীয় শিল্পের ঐতিহ্য ও নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে গভীর শিক্ষা লাভ করেন। তবে চলচ্চিত্র তখনও তাঁর পেশা হয়ে ওঠেনি।
শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় ফিরে তিনি ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থা ডি জে কিমার-এ গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি বইয়ের প্রচ্ছদ ও অলংকরণও করতেন। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত বইগুলোর প্রচ্ছদ আঁকার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীসত্তার পরিচয় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এরই মধ্যে চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ ক্রমশ গভীর হতে থাকে। ফরাসি চলচ্চিত্রকার জ্যঁ রেনোয়ার কলকাতায় The River ছবির শুটিং করতে আসা এবং পরে ১৯৫০ সালে সত্যজিতের ইউরোপ সফর তাঁর চলচ্চিত্র-ভাবনায় বড় পরিবর্তন আনে। ইউরোপে গিয়ে তিনি ভিট্টোরিও দে সিকার Bicycle Thieves দেখেন। ছবিটি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
সত্যজিৎ বুঝতে পারেন-বড় বাজেট, তারকা কিংবা বিশাল আয়োজন ছাড়াও সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে অসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব। এরপর শুরু হয় এক কঠিন পথচলা। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু নতুন পরিচালক, সীমিত অর্থ এবং অভিজ্ঞতার অভাব-সব মিলিয়ে কাজটি সহজ ছিল না। ১৯৫২ সালে শুরু হয় ছবিটির শুটিং।
অর্থের সংকটে বহুবার কাজ বন্ধ রাখতে হয়। সত্যজিৎ নিজের বেতনের টাকা খরচ করেন, এমনকি ব্যক্তিগত সামগ্রীও বন্ধক রাখতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আর্থিক সহায়তায় চলচ্চিত্রটির কাজ শেষ করা সম্ভব হয়। ১৯৫৫ সালে মুক্তি পায় ‘পথের পাঁচালী’। ছবিটি শুধু দর্শকের প্রশংসাই পায়নি; বিশ্ব চলচ্চিত্রেও তৈরি করে ব্যাপক আলোড়ন। ১৯৫৬ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটি ‘Best Human Document’ পুরস্কার লাভ করে। ভারতীয় চলচ্চিত্রের জন্য এটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এরপর সত্যজিৎ রায় আর থেমে থাকেননি।
অপরাজিত এবং অপুর সংসার নির্মাণের মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ করেন তাঁর বিখ্যাত ‘অপু ট্রিলজি’। অপু নামের এক বাঙালি তরুণের জীবন, স্বপ্ন, দুঃখ, প্রেম ও বেড়ে ওঠার গল্প হয়ে ওঠে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় কাহিনি। তবে সত্যজিৎ শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতা ছিলেন না।
তিনি ছিলেন লেখক, চিত্রনাট্যকার, সংগীত পরিচালক, চিত্রকর ও গ্রাফিক শিল্পী। তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র ফেলুদা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্রে পরিণত হয়। একইভাবে বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কুও পাঠকের কল্পনার জগতে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। চলচ্চিত্রেও তাঁর সৃষ্টির পরিধি ছিল বিস্তৃত। অপরাজিত, অপুর সংসার, জলসাঘর, দেবী, চারুলতা, নায়ক, গুপী গাইন বাঘা বাইন, অরণ্যের দিনরাত্রি, সীমাবদ্ধ, জন অরণ্য, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি, ঘরে বাইরে সহ অসংখ্য চলচ্চিত্রে তিনি মানুষের সম্পর্ক, সমাজ, রাজনীতি, শ্রেণি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের নানা দিক তুলে ধরেছেন।
তাঁর চলচ্চিত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল-তিনি সাধারণ মানুষের জীবনকে অসাধারণ করে দেখাতে পারতেন। বড় কোনো ঘটনা ছাড়াও একটি পরিবার, একটি সম্পর্ক, একটি শহর কিংবা একজন মানুষের নীরব অনুভূতির মধ্যেও তিনি নাটক খুঁজে পেতেন। ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন সৃজনশীলতার ধারক। ১৯৪৯ সালে তিনি বিজয়া রায়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র সন্তান সন্দীপ রায় পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে কাজ করেন।
সত্যজিৎ রায়ের প্রতিভার স্বীকৃতি এসেছে দেশ-বিদেশ থেকে। তিনি পেয়েছেন বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ১৯৮৪ সালে ঘরে বাইরে চলচ্চিত্রের জন্য ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পরিচালকের সম্মান পান। ১৯৮৫ সালে ভারত সরকার তাঁকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে সম্মানিত করে। ১৯৮৭ সালে পান ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘লেজিওঁ দ'অনর’। আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিগুলোর একটি। ১৯৯২ সালে চলচ্চিত্রে আজীবন অবদানের জন্য তাঁকে দেওয়া হয় একাডেমি অনারারি অ্যাওয়ার্ড-অস্কার।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে সে সময় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো অস্কারের অনুষ্ঠানটি হাসপাতালের কক্ষে বসেই গ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, জীবনের এত বছর চলচ্চিত্র নির্মাণের পর এই সম্মান তাঁর কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অস্কার পাওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন সত্যজিৎ রায়। বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি থেমে যায়নি।
আজও পথের পাঁচালী দেখলে অপু-দুর্গার শৈশব আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। চারুলতায় চোখে পড়ে এক নারীর নিঃসঙ্গতা। নায়ক আমাদের নিয়ে যায় একজন তারকার ভেতরের জগতে। আর ফেলুদার গল্পে নতুন প্রজন্মও খুঁজে পায় রহস্যের রোমাঞ্চ। সত্যজিৎ রায় শুধু চলচ্চিত্র বানাননি। তিনি ক্যামেরার মাধ্যমে মানুষের জীবনকে দেখার একটি নতুন ভাষা তৈরি করেছিলেন। তাঁর চলচ্চিত্রে ছিল না কৃত্রিম জাঁকজমক; ছিল মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন, ব্যর্থতা, সম্পর্ক আর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্ত।
এই কারণেই মৃত্যুর তিন দশকেরও বেশি সময় পরও সত্যজিৎ রায় কেবল একজন চলচ্চিত্রকারের নাম নন-তিনি বাংলা ও বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়।
জ/উ