ফ্রিজ এমন একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র, যা দিনের পর দিন, বছরের পর বছর প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে চালু থাকে। ফলে বাড়ির মাসিক বিদ্যুৎ বিলের একটি অংশ ফ্রিজের পেছনেও যায়। বিশেষ করে পুরোনো, ত্রুটিপূর্ণ বা ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না করা ফ্রিজ তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎ খরচ করতে পারে।
তবে ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সব সময় নতুন ফ্রিজ কিনতে হবে এমন নয়। ব্যবহারের কিছু ছোট অভ্যাস পরিবর্তন করেও ফ্রিজকে তুলনামূলক দক্ষভাবে চালানো সম্ভব। এর মধ্যে সহজ একটি কৌশল হলো ফ্রিজের খালি জায়গায় পানিভর্তি বোতল রাখা।
ফ্রিজের ভেতরে অনেকটা খালি জায়গা থাকলে দরজা খোলার সময় বাইরের উষ্ণ বাতাস সহজেই ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর সেই বাতাসকে আবার ঠান্ডা করতে ফ্রিজের কম্প্রেসরকে কাজ করতে হয়।
ফ্রিজের ভেতরে পানিভর্তি বোতল থাকলে ঠান্ডা পানির তাপ ধারণক্ষমতা ভেতরের তাপমাত্রা তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে ফ্রিজে অনেকটা খালি জায়গা থাকলে পানির বোতল দিয়ে সেই জায়গার কিছুটা পূরণ করা যায়। কিছু সরকারি এনার্জি গাইডেও খালি জায়গা পূরণে পানির বোতল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে কয়েকটি পানির বোতল রাখলেই বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ফ্রিজের বিদ্যুৎ খরচ নির্ভর করে এর বয়স, মডেল, তাপমাত্রার সেটিং, দরজা খোলার অভ্যাস, দরজার রাবার সিল এবং আশপাশের পরিবেশের তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
ফ্রিজে পানির বোতল রাখার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি।
প্রথমে পরিষ্কার এবং ভালোভাবে বন্ধ করা যায় এমন বোতলে পানি ভরুন। বোতলগুলো এমনভাবে রাখুন, যাতে ফ্রিজের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস চলাচলে বাধা না পড়ে।
একসঙ্গে অতিরিক্ত বোতল রেখে ফ্রিজ ঠাসা করে ফেলবেন না। খাবার ও ঠান্ডা বাতাস চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রাখা প্রয়োজন।
আর যদি পানি জমিয়ে বরফ করতে চান, বোতল একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ করবেন না। পানি বরফে পরিণত হলে আয়তন বাড়ে। এতে বোতল ফুলে যেতে বা ফেটে যেতে পারে।
শুধু পানির বোতল রাখার ওপর নির্ভর না করে দৈনন্দিন ব্যবহারে কয়েকটি অভ্যাস মেনে চললেও ফ্রিজ তুলনামূলক দক্ষভাবে চালানো যায়।
বারবার দরজা খুললে বাইরের উষ্ণ বাতাস ফ্রিজের ভেতরে ঢুকে পড়ে। ফলে নির্ধারিত তাপমাত্রা বজায় রাখতে কম্প্রেসরকে আবার কাজ করতে হয়।
তাই ফ্রিজ খোলার আগে কী নিতে হবে তা ঠিক করে নিন এবং প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে দ্রুত দরজা বন্ধ করুন। অপ্রয়োজনে ফ্রিজের দরজা খোলা রাখা এড়িয়ে চলুন।
ফ্রিজকে দেয়ালের সঙ্গে একেবারে ঠেস দিয়ে রাখবেন না। পেছন ও আশপাশে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকলে ফ্রিজ থেকে উৎপন্ন তাপ বাইরে বের হতে সুবিধা হয়।
ফ্রিজ বসানোর সময় প্রস্তুতকারকের নির্দেশনায় উল্লেখ করা প্রয়োজনীয় দূরত্ব বজায় রাখুন। এতে যন্ত্রটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে এবং তুলনামূলক দক্ষভাবে ঠান্ডা করতে সাহায্য করতে পারে।
ফ্রিজের দরজার রাবার সিল ঢিলা, ফাটা বা নষ্ট হয়ে গেলে ঠান্ডা বাতাস বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে এবং উষ্ণ বাতাস ভেতরে ঢুকতে পারে। এতে ফ্রিজকে বেশি সময় কাজ করতে হয়।
তাই দরজার সিল নিয়মিত পরীক্ষা করুন এবং প্রয়োজন হলে তা মেরামত বা পরিবর্তন করুন।
খুব গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখলে ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তখন খাবার ঠান্ডা করতে ফ্রিজকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। তাই সম্ভব হলে খাবার কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার পর ফ্রিজে রাখুন।
সব মিলিয়ে, ফ্রিজে পানির বোতল রাখা বিদ্যুৎ খরচ কমানোর একটি ছোট কৌশল হতে পারে, বিশেষ করে যখন ফ্রিজে অনেকটা খালি জায়গা থাকে। তবে এর পাশাপাশি দরজা কম খোলা, সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা, দরজার সিল ঠিক রাখা এবং ফ্রিজের চারপাশে পর্যাপ্ত জায়গা রাখার মতো অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় ঠিক রাখলে ফ্রিজকে আরও দক্ষভাবে চালানো সম্ভব।
চুলা থেকে নামানো খুব গরম খাবার সরাসরি ফ্রিজে রাখলে ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। খাবার কিছুটা ঠান্ডা হওয়ার পর সংরক্ষণ করা ভালো। তবে নিরাপত্তার জন্য রান্না করা খাবার দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় রেখে দেওয়া উচিত নয়।
ফ্রিজের দরজার রাবার সিল ঢিলা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে। তখন কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রা ধরে রাখতে ফ্রিজকে বেশি সময় কাজ করতে হতে পারে। তাই সিল ঠিকমতো আটকে আছে কি না নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
ফ্রিজকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঠান্ডা করে রাখলে বিদ্যুৎ খরচ বাড়তে পারে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের নির্দেশনায় সাধারণ রেফ্রিজারেটরের জন্য প্রায় ৩৬ থেকে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, অর্থাৎ প্রায় ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে আপনার ফ্রিজের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনাই অনুসরণ করা উচিত।
পুরোনো মডেলের কিছু ফ্রিজে পেছনে বা নিচে কনডেনসার কয়েল থাকে। সেখানে ধুলো জমলে তাপ বের হওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ফ্রিজকে বেশি পরিশ্রম করতে হতে পারে। পরিষ্কার করার আগে অবশ্যই প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা দেখুন এবং প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন। এছাড়াও পুরোনো মডেলের ফ্রিজের ক্ষেত্রে কয়েল পরিষ্কার রাখা জরুরি।
ফ্রিজ কোথায় রাখা হচ্ছে, সেটিও বিদ্যুৎ খরচে প্রভাব ফেলতে পারে। চুলা, ওভেন বা সরাসরি রোদ পড়ে এমন জায়গার পাশে ফ্রিজ রাখলে বাইরের তাপের কারণে যন্ত্রটিকে বেশি কাজ করতে হতে পারে। তাই তুলনামূলক ঠান্ডা ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় ফ্রিজ রাখা ভালো।
পানিভর্তি বোতল ফ্রিজের খালি জায়গা পূরণ করে ঠান্ডা ধরে রাখতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে। তবে এটিকে বিদ্যুৎ বিল কমানোর কোনো নিশ্চিত বা বড় ধরনের উপায় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
ফ্রিজের মোট বিদ্যুৎ খরচে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে যন্ত্রের দক্ষতা, বয়স, আকার, দরজার সিল, তাপমাত্রা সেটিং এবং ব্যবহারের ধরন। ভালো মডেলের ফ্রিজ সাধারণ মডেলের তুলনায় কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।
তাই খালি ফ্রিজে পানির বোতল রাখা যেতে পারে একটি সহজ অভ্যাস হিসেবে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল কমানোর জন্য এর পাশাপাশি দরজা কম খোলা, সঠিক তাপমাত্রা রাখা, দরজার সিল ঠিক রাখা এবং ফ্রিজের চারপাশে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করাও জরুরি।
জ/রা