ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক অঙ্গন। বিএনপির প্রভাবশালী নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসনটিতে এরই মধ্যে বইতে শুরু করেছে ভোটের হাওয়া। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৯ অক্টোবর এ আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
মির্জা ফখরুলের অনুপস্থিতিতে আসনটিতে চাঙা হয়ে উঠেছে জামায়াতের নির্বাচনি তৎপরতা। অন্যদিকে বিএনপি এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত না করলেও আসনটি ধরে রাখতে মরিয়া। এর মধ্যেই রাষ্ট্রপতির ভাই ও মেয়েকে ঘিরে দলটির ভেতরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রার্থী ও দলকেন্দ্রিক হিসাব-নিকাশও তত স্পষ্ট হচ্ছে। এরই মধ্যে মাঠে সক্রিয় হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মো. দেলাওয়ার হোসেন। দলীয় সমর্থন বাড়ানোর পাশাপাশি তৃণমূলে গণসংযোগ এবং নিজস্ব ভোটব্যাংক শক্তিশালী করতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির ‘ধানের শীষের’ সম্ভাব্য শক্ত প্রার্থী হিসেবে জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি এবং রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, পারিবারিক অবস্থান ও তৃণমূলের বড় অংশের সমর্থনের কারণে তাকে বিএনপির সম্ভাব্য সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রার্থী হিসেবে দেখছেন দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকে।
আগের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ২ লাখ ২৮ হাজার ৭৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৪ ভোট।
গত ৬ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় মাঠে রাষ্ট্রপতিকে দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও মির্জা পরিবারের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অনুষ্ঠানে বক্তাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে আশা প্রকাশ করেন, এখন থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতির হাল ধরবেন মির্জা ফয়সাল আমিন।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে রাষ্ট্রপতির জ্যেষ্ঠ কন্যা ড. শামারুহ মির্জাকে ঘিরেও গুঞ্জন রয়েছে। যদিও রাজনীতিতে আসা বা পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ড. শামারুহ মির্জা।
স্থানীয় নাগরিকদের অনেকে মনে করেন, ঠাকুরগাঁওয়ে বাস্তবায়িত বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে মির্জা ফয়সাল আমিনের বিকল্প নেই।
ঠাকুরগাঁও লাউ থুতি উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুর রশিদ বলেন, উপনির্বাচনে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে জামায়াত, ছাত্রশিবিরসহ কয়েকটি শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে ভোটারদের বড় একটি অংশের দাবি, এই ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা নির্বাচনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারবে না।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ভোট রয়েছে। নির্বাচনের ফল নির্ধারণে এই ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সচেতন মহলের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় এসব সম্প্রদায়ের ভোটাররা অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রার্থীর প্রতি বেশি আগ্রহী হতে পারেন।
উত্তর হরিহরপুর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রসুল মনে করেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে উগ্রবাদের কোনো স্থান নেই।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলীও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘এলাকার চলমান উন্নয়ন ত্বরান্বিত রাখতে সাধারণ মানুষ সঠিক সিদ্ধান্তই বেছে নেবেন। কেন্দ্র থেকে দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে শিগগিরই।’
সম্ভাব্য প্রার্থী মির্জা ফয়সাল আমিন বলেন, ‘অঘোষিতভাবে আমি এই নির্বাচনে বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী। তবে অফিসিয়াল প্রসেস এখনো শুরু হয়নি। শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
অন্যদিকে এসব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশকে গুরুত্ব না দিয়ে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘জনগণ আমাকে প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিলে এলাকায় টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। চাঁদাবাজি, সিন্ডিকেট দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নে আমি আপসহীন থাকব।’
জ/উ