খুলনার দৌলতপুরের ওই ছোট গলিটায় ঢুকলে এখনো পাটের মেটে মেটে গন্ধ পাওয়া যায়। তবে সে গন্ধের সাথে এখন আর কোনো তাজা জীবনের ঘ্রাণ নেই; মিশে আছে শুধু নোনা জল, জং ধরা লোহা আর চারপাশের ভেজা নর্দমার ভ্যাপসা গন্ধ। একসময় ভোর চারটে বাজার সাথে সাথে রাষ্ট্রায়ত্ত 'প্লাটিনাম জুবিলাই জুট মিলস'-এর বাঁশি যখন বেজে উঠত, এই গলিটা যেন হঠাৎ ঘুম ভেঙে জেগে উঠত। হাজার হাজার পায়ের শব্দ, কাঁসার থালায় ভাত বাড়ার শব্দ, আর নারী শ্রমিকদের চুড়ির টুনটুন শব্দে মুখরিত হয়ে উঠত পুরো খলিশপুর-দৌলতপুর বেল্ট।
আজ সেই বাঁশি বাজেন না। আজ আর বাঁশির সাথে জীবন দৌড়ায় না। এখন শুধু ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, সময় পার হয়, আর বেঁচে থাকার একটা কঠিন, নির্মম লড়াই নিঃশব্দে চলে গলিটার প্রতিটি অন্ধকার ঘরে।
সেই গলিরই শেষ প্রান্তে, সাড়ে চার হাত বাই ছয় হাতের একটা টিনের চাল দেওয়া ঘর। বর্ষায় চাল ফুটো হয়ে জল পড়ে, আর চৈত্র-বোশেখে টিনগুলো তেতে যেন তন্দুর রুটি ছ্যাঁকার আগুনের মতো উত্তাপ ছড়ায়। এই ঘরে থাকে ময়না বেগম। বয়স বয়স হয়েছে বললে ভুল হবে, বয়সের চেয়েও বেশি ছাপ ফেলেছে জীবনের নির্মম চাবুকের দাগ। ময়নার বয়স এখন চার কুড়ি ছুঁইছুঁই, নাকি চল্লিশের কোঠায়? নিজের সঠিক বয়স ময়না নিজেও জানে না। কিন্তু তার ক্ষয়ে যাওয়া দুটো হাত, কোটরগত শূন্য দুটো চোখ আর শুষ্ক চামড়া জানান দেয়-সে শুধু বয়স বাড়ায়নি, এক একটা বছরকে হাড়ে হাড়ে বয়েছে।
একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের 'স্পিনিং সেকশন'-এ কাজ করত ময়না। সুতো কাটা ছিল তার হাতযশ। সুতোর বুননে যেভাবে পাটের গোছা জড়িয়ে যেত, ঠিক সেভাবেই তার জীবনের পুরো অস্তিত্বটাই জড়িয়ে গিয়েছিল ওই পাটকলের বিশাল চার দেয়ালের মধ্যে। কিন্তু গত তিন-চার বছর ধরে তার সে জীবন যেন সুতোর মতোই হুট করে ছিঁড়ে গেছে। জোড়া আর লাগেনি।
ময়নার জন্ম হয়েছিল বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের এক নদীভাঙা গ্রামে। মেঘনার পেটে যখন বাপের সামান্য ভিটেমাটিটুকু তলিয়ে গেল, তখন ময়না দশ বছরের একটা ছোট মেয়ে। পেটের দায়ে বাপের হাত ধরে খুলনা শহরের পথ ধরেছিল তারা। খলিশপুরের জুট মিলের ধোঁয়া-ওঠা চিমনিগুলো তখন কত মানুষের জীবনের আশ্রয়স্থল! বাপের হাত ধরে পাটকলে বদলি শ্রমিক হিসেবে ঢুকিছিল ময়না।
তারপরের গল্পটা খুব চেনা। একই মিলের জাঁতাকলে কাজ করা এক স্থায়ী শ্রমিকের সাথে বিয়ে, দুটো সন্তানের জন্ম, আর তারপর হঠাৎ এক রাতে ক্যানসারে স্বামী মোস্তফার বিদায়। মোস্তফা চলে যাওয়ার পর ময়নার চোখের সামনে পুরো দুনিয়া অন্ধকার হয়ে এসেছিল। কিন্তু কাঁধে তখন দুই দুধের শিশু-ছেলে মান্নান আর মেয়ে মরিয়ম। ময়না চোখের জল মোছারও সময় পায়নি। কেঁদে লাভ কী, যখন পেটের খিদে কোনো কান্না বোঝে না?
ময়না জুট মিলের স্পিনিং সেকশনে দৈনিক হাজিরা ভিত্তিক থেকে বদলি শ্রমিকের কাজটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিল। তখন কাজ ছিল কঠিন, কিন্তু কাজের শেষে মাস গেলে বা সপ্তাহ শেষে যে টাকাটা হাতে আসত, তাতে অন্তত দু-বেলা দুটো ডাল-ভাত জুটত। ছেলেমেয়ে দুটোকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল।
সকাল ছয়টার শিফট হলে ময়নাকে উঠতে হতো রাত চারটেয়। ছেলেমেয়েদের জন্য আগের রাতের বাসি পান্তা বা একটু রুটি শ্যাঁকা রেখা ছুটে যেত মিলের গেটে। কারখানার সেই বিশাল শেডের নিচে যখন ডজন ডজন ভারী জুট মেশিন একসাথে গর্জে উঠত, সেই গমগম শব্দে অন্য কারও কথা শোনার জো থাকত না। বাতাস জুড়ে উড়ত পাটের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ধুলো আর আঁশ। সেই ধুলো নিঃশ্বাসের সাথে ফুসফুসে ঢুকে যেত। প্রথম প্রথম খুব কাশি হতো, চোখ জ্বালা করত। পরে ওটাই সয়ে গিয়েছিল।
ময়না বলত, "এই পাটের ধুলোই তো আমাগো রুটি দেয় রে। এ ধুলো খারাপ না, এ ধুলো সোনার ধুলো।"
হ্যাঁ, সোনালী আঁশের সেই সোনার ধুলোতেই ময়না স্বপ্ন বুনেছিল। ভেবেছিল, মান্নানটাকে অন্তত ম্যাট্রিক পাস করাবে। মরিয়মটাকে কোনো ভালো ঘরে বিয়ে দেবে। জুট মিলের জমানো প্রোভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির টাকায় নিজের একটা এক চিলতে জমি হবে। কিন্তু জীবন তো কোনো সোজা লাইনে চলা রেলগাড়ি নয়; মাঝপথেই যে লাইনচ্যুত হয়ে খাদে পড়বে, তা ময়না ঘুমেও ভাবেনি।
২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়টা যেন জীবনের ওপর নেমে আসা একটা কালবৈশাখী ঝড়। বিশ্বজুড়ে তখন কোভিডের আতঙ্ক। তার ওপর হঠাৎ একদিন রেডিও-টিভিতে আর খবরের কাগজে কালো অক্ষরে খবর ছড়ালো-সরকার নাকি সব লোকসানি রাষ্ট্রায়ত্ত জুট মিল বন্ধ করে দেবে!
প্রথম প্রথম কেউ বিশ্বাস করেনি। ময়নাদের মতো সাধারণ শ্রমিকদের ধারণা ছিল, জুট মিল হলো দেশের রত্ন, এগুলো কখনো বন্ধ হতে পারে? কত সরকার এলো, কত সরকার গেল, জুট মিল তো ঠিকই চলল! কিন্তু গুজবটা যখন সত্যি হয়ে সামনে এলো, তখন যেন আকাশ ভেঙে পড়ল দৌলতপুর-খলিশপুরের মাথায়।
সেই দিনটার কথা ময়না জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ভুলবে না। জুলাইয়ের এক বৃষ্টিভেজা সকাল। বর্ষার জলে নর্দমা উপচে পড়ছে। মিলের গেটে গিয়ে তারা দেখল এক বিরাট তালা ঝুলছে। বিশাল বড় নোটিশ টাঙানো-"রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসমূহের উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হইল।"
গেটজুড়ে সারি সারি পুলিশ আর আনসার ব্যাটালিয়ন। জুট মিলের হাজার হাজার শ্রমিক বৃষ্টিতে ভিজে কান্না আর চিৎকারে ফেটে পড়ল। চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর ধরে যেসব কারখানায় লাখ লাখ মানুষের ঘাম আর রক্ত ঝরেছে, যে কারখানার চাকা ঘুরলে পুরো শহরের পেটে ভাত জুটত, সেই কারখানা এক নিমেষে এক টুকরো সরকারি কাগজে ইতিহাস হয়ে গেল!
বয়স্ক শ্রমিকরা গেটের সামনে আছাড় খেয়ে কাঁদতে লাগল। অনেক নারী শ্রমিক তাদের বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল কাদা জলের ওপর। ময়না স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল, তার পায়ের নিচের মাটিটা হঠাৎ উধাও হয়ে গেছে। সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল তার দুই সন্তান, তাদের বকেয়া স্কুলের ফি, চালের ড্রাম আর বাড়িওয়ালার রাগত মুখ।
সরকার থেকে বলা হয়েছিল-"এককালীন পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হবে", "আধুনিকীকরণ করে আবার চালু হবে", "লিজ দেওয়া হবে"। কিন্তু সাধারণ বদলি আর অস্থায়ী শ্রমিকদের কপালে কী জোটে? স্থায়ী শ্রমিকরা কিছু পাওনা পেলেও ময়নার মতো হাজার হাজার বদলি ও দিনমজুর শ্রমিকদের হাত রয়ে গেল খালি। প্রোভিডেন্ট ফান্ডের ফাইল, বদলি কার্ডের কাগজ আর বকেয়া মজুরির রসিদ হাতে নিয়ে মাসের পর মাস তারা মিলের দপ্তরে, ট্রেড ইউনিয়নের নেতাদের পিছে ঘুরেছে। দিন গেছে, বছর পার হয়েছে, কিন্তু বকেয়া খাতার ধুলো আর সরেনি।
জুট মিল বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে যেন পুরো শহরের একটা অঙ্গ কেটে ফেলা হলো। খলিশপুরের সেই জমজমাট চিত্রালী বাজার, যেখানে বৃহস্পতিবারের মজুরি পাওয়ার পর শ্রমিকদের ভিড় জমে উঠত, তা হঠাৎ খাঁ খাঁ করতে লাগল। কাপড়ের দোকানদার, চালের আড়তদার, চা-ওয়ালা থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালা-সবার মুখে চরম হতাশা। কারণ, যাদের হাতে টাকা ছিল, সেই শ্রমিকদের পকেট এখন শূন্য।
ময়নার জমানো বলতে কিছু টাকা ছিল, যা খুব বেশিদিন চলেনি। চার সদস্যের সংসারে জমানো পুঁজি শেষ হতে সময় লাগে না। চালের দাম বাড়ে, তেলের দাম বাড়ে, বাড়িওয়ালার ভাড়া বাকি পড়তে থাকে। শুরু হলো টিকে থাকার এক নিষ্ঠুর সংগ্রাম।
প্রথমে ময়না কাজ খুঁজতে শুরু করল লোকের বাড়ি বাড়ি। কিন্তু যে শহরে হাজার হাজার শ্রমিক পরিবার একসাথে বেকার হয়ে পড়েছে, সেখানে বুয়ার কাজ পাওয়াও কি এত সহজ? এক একটা কাজের জন্য দশজন নারী শ্রমিক দাঁড়িয়ে যেত। তাও মনের জোর হারিয়ে ফেলেনি ময়না। খলিশপুরের বিভিন্ন মেসে, বড়লোকের বাসায় ঝি-এর কাজ করা শুরু করল।
সকালে চারটে মেসে ঝাড়ু-পোছা, বাসন মাজা আর রাত পর্যন্ত অন্য দুটো বাড়িতে রান্না। যে হাতে সে জুট মিলের জটিল মেশিন চালাত, যে হাতের সুতো কাটা ছিল দেখার মতো, সেই হাত দিয়ে এখন তাকে প্রতিদিন অন্যের এঁটো বাসন মাজতে হয়। তাতেও আফসোস ছিল না, যদি পেটটা ভরতো। কিন্তু এই বয়সে টানা এত খাটুনি আর জুট মিল থেকে উপহার পাওয়া ফুসফুসের পুরনো হাঁপানি-সব মিলিয়ে শরীর আর সঙ্গ দিচ্ছিল না।
বাড়িতে অশান্তির কালো ছায়া নামতে শুরু করল। ছেলে মান্নান, যার বয়স তখন সতেরো, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেল। ম্যাট্রিক পরীক্ষাটা আর দেওয়া হলো না। টাকার অভাবে টেস্ট পরীক্ষার ফি দিতে পারেনি সে। রাগ, ক্ষোভ আর হতাশায় ছেলেটা দিন দিন বদলে যেতে লাগল। যে ছেলে একসময় বই নিয়ে পড়ে থাকত, সে এখন সারাদিন বেকার মোড়ের মাথায় বসে থাকে। খারাপ সঙ্গতের চক্করে পড়ে গেল।
ময়না কাঁদে, "বাবা রে, একটা যা হোক কাজ কর। ইজিবাইক চালা, কিংবা কোনো দোকানে বস।"
মান্নান ক্ষোভের সাথে চেঁচিয়ে ওঠে, "কোথায় কাজ? কার দোকানে বসব? বাজারে কারও ব্যবসা আছে? জুট মিলের সাথে সাথে এই শহরের সব মরে গেছে মা! তুমি বুঝবা না!"
মেয়ে মরিয়মটা শান্ত স্বভাবের। সে মায়ের দুঃখ বুঝত। মায়ের সাথে সাথে সেও লুকিয়ে লুকিয়ে সেলাইয়ের কাজ খোঁজার চেষ্টা করত। কিন্তু কাজের বাজার তখন এতই মন্দা যে, জামার আলপিন কেনার টাকাও ওঠানো দায় ছিল।
মানুষের জীবন যখন খারাপের দিকে যায়, তখন যেন সব দিক থেকেই একসাথে আঘাত আসতে থাকে। ময়নার পরিবারেও তাই হলো।
২০২২ সালের শেষের দিকে, শীতের এক সন্ধ্যায় মান্নান ঘরে ফিরে এলো না। ময়না সারারাত গলির মোড়ে, রাস্তার ধারে খুঁজে বেড়ালো। পরদিন সকালে খবর এলো, মান্নানকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। অভিযোগ-সে নাকি বন্ধুদের সাথে মিলে একটা ছিনতাইয়ের সাথে জড়িয়ে পড়েছে।
খবরটা শুনে ময়না যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানেই ধপ করে বসে পড়ল। যে ছেলেকে সে বুক আগলে, পাটের ধুলো খাইয়ে মানুষ করেছিল, সে আজ অপরাধী?
কোর্ট-কাছারি, থানা-পুলিশ করার মতো এক পয়সাও ময়নার কাছে ছিল না। কত মানুষের পায়ে যে সে ধরেছে! জুট মিলের পুরনো সিবিএ নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে কেঁদেছে-"ভাইরে, আমাগো পাওনা টাকাটা পাইয়া দিলে আমার পোলাডারে জামিন করতাম! ও কোনো খারাপ পোলা না, ও পেটের খিদায় পথ হারাইছে!"
কিন্তু কে শোনে কার কথা? জুট মিল বন্ধ হওয়ার পর সেই নেতারাও যার যার মতো সটে পড়েছে। কড়া নাড়ার মতো কোনো দরজাই আর খোলা ছিল না। শেষ পর্যন্ত ঘরের শেষ সম্বল-একজোড়া রূপার চুড়ি আর স্বামীর রেখে যাওয়া একটা পুরনো পিতলের লণ্ঠন বিক্রি করে উকিল দাঁড় করাতে হয়েছিল। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। প্রমাণের অভাবে আর জামিনের টাকা যোগাড় না হওয়ায় মান্নানের ঠাঁই হলো জেলে।
ছেলের এই পরিণতি সহ্য করতে না পেরে মেয়ে মরিয়মও ভেতরে ভেতরে একদম ভেঙে পড়ল। চেনা এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় এসে প্রস্তাব দিল, ঢাকায় এক গার্মেন্টসে কাজ পাইয়ে দেবে। মরিয়ম মায়ের মুখ পানে চেয়ে সিদ্ধান্ত নিল সে ঢাকা যাবে। যেদিন মরিয়ম একটা ছোট প্লাস্টিকের ব্যাগে দুটো জামা গুটিয়ে নিয়ে রওনা হচ্ছিল, ময়না তার হাত দুটো শক্ত করে ধরেছিল। "আমারে ছাইড়া যাস নে মা! তুইও গেলে আমি এই খালি ঘরে কেমনে থাকুম?" ময়না ফুঁপিয়ে উঠেছিল।
মরিয়ম মায়ের শুকনো গাল দুটো মুছে দিয়ে বলেছিল, "মা, এই শহরে থাকলে আমরা সবাই না খাইয়া মরুম। ভাইটা জেলে, তারে ছাড়াইতে টাকা লাগব। ঘরের ভাড়া দিতে পারো না, বাড়িওয়ালা রোজ গালাগালি করে। আমি ঢাকা যাই, অন্তত কিছু টাকা তো পাঠাইতে পারুম।"
মরিয়ম চলে গেল। রেখে গেল এক মস্ত খালি ঘর আর ময়নার একাকী নীরব হাহাকার। ময়না এখন একদম একা। বয়স আর শারীরিক অসুস্থতা তাকে পুরোপুরি কাবু করে ফেলেছে। তার হাঁপানির টানটা এখন অনেক বেড়েছে। একটু হাঁটলেই দম আটকে আসে। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ কেনার ক্ষমতা নেই। মোড়ের ফার্মেসি থেকে দু-টাকার একটা হাঁপানির বড়ি কিনে খেয়ে কোনোমতে রাতে একটু শোয়ার চেষ্টা করে।
বাড়িওয়ালা জয়নাল সাহেব আর ধৈর্য ধরতে পারছিলেন না। টানা চার মাসের ভাড়া বাকি। একদিন সকালে এসে সোজা জানিয়ে দিলেন, "ময়নার মা, আগামীকালের মধ্যে ঘর খালি করে দাও। আমি আর লোকসান গুনতে পারব না। জুট মিল বন্ধ হইছে চার বছর, আর তুমি এখনো জুট মিলের দোহাই দিয়া ভাড়া বাকি রাখবা, তা তো হয় না!"
ময়না আঁচল পেতে জোড়হাত করল, "ও জয়নাল ভাই, আমারে এই পচুর (প্রচণ্ড) শীতের মধ্যে রাস্তায় ফেলো না। আমার মাইয়াডা ঢাকা থিকা এই মাসে টাকা পাঠাইলেই আমি সব শোধ কইরা দিমু।" কিন্তু জয়নাল সাহেবের মন গলল না। তিনি চলে গেলেন হুমকি দিয়ে।
ময়না ঘরের মেঝেবসে রইল। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে না আর, কারণ চোখের জল বোধহয় বহু আগেই শুকিয়ে গেছে। তার মনে পড়ল, এই ঘরের ভেতরেই একসময় তার স্বামী মোস্তফা হাসিমুখে কাজ থেকে ফিরত। এই ঘরেই ছোট মান্নান আর মরিয়ম কোল জুড়ে শুয়ে থাকত। আজ সেই ঘরে সে একা, আর কাল হয়তো এই ভিটেও তার থাকবে না।
বিকেলে ময়না ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে জুট মিলের দিকে গেল। তার শরীরটা আজ খুব দুর্বল লাগছে, মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিচ্ছে। তাও কেমন এক অদৃশ্য টানে সে জুট মিলের প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বিশাল লোহার গেটটায় এখন পুরু হয়ে জং ধরেছে। গেটের ভেতরে বড় বড় ঘাস আর আগাছা জমেছে। একসময় যে গেট দিয়ে হাজার হাজার মানুষ হাসিমুখে ঢুকত, সেই গেটটা এখন যেন কোনো এক বিশাল কবরস্থানের প্রবেশদ্বার। গেটের পাশে টুলের ওপর বসে আড্ডা দিচ্ছিল কয়েকজন পুরনো সহকর্মী। সবার চেহারাতেই সেই একই ছাপ-ক্ষয়, দারিদ্র্য আর চরম হতাশা।
ময়নাকে দেখে সাবেক লাইন সরদার রফিক শেখ বললেন, "কী রে ময়না? শরীলে তো মাংস বলতে কিছু নাই। চোখ দুটো তো ভেতরে ঢুইকা গেছে। খোঁজ খবর কিছু পাইলি তোদের বকেয়া টাকার?"
ময়না নিচু স্বরে বলল, "না রে রফিক ভাই। কোনো খবর নাই। আফিস (অফিস) তো খোলেই না। পোলডা জেলে পইড়া আছে, মাইয়াডা ঢাকায় গ্যাছে... আর আমি কালকে ঘর ছাড়ুম। জয়নাল ভাই তাড়াইয়া দিতাছে।"
রফিক শেখ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "আমাগো কার কপাল ভালো বল ময়না? ওই যে দ্যাখ, প্লাটিনামের মেইন রোডে আগে যেখানে চারটে কাপড়ের দোকান ছিল, সেখানে এখন সোবহান ভাই পুরনো প্যান্ট সেলাই করে। ওর ঘরে চারটা কন্যে দায়গ্রস্ত। আর সিরাজের কথা মনে আছে? স্পিনিংয়ের হেড মিস্ত্রি ছিল? সে এখন ইজিবাইক চালায়। গত মাসে অ্যাকসিডেন্ট কইরা ঠ্যাংডা ভাঙছে, এখন ভিক্ষা ছাড়া উপায় নাই।"
ময়না নীরব হয়ে রইল। তার মনে হলো, এ শুধু তার একার করুণ কাহিনী নয়। এ হলো হাজার হাজার পরিবারের মৃত্যুর গল্প। একটা কারখানা বন্ধ হলে শুধু একটা বিল্ডিং বন্ধ হয় না; তার সাথে বন্ধ হয়ে যায় হাজার হাজার ঘরের উনুন, হাজার হাজার শিশুর ভবিষ্যৎ, আর লাখ লাখ মানুষের আত্মসম্মান। হঠাৎ করেই ময়নার মনে হলো বুকের ভেতর প্রচণ্ড একটা যন্ত্রণা হচ্ছে। দম আটকে আসছে। পাটের ধুলোয় ক্ষয়ে যাওয়া তার ফুসফুস দুটো যেন আর বাতাস টানতে পারছে না। সে গেটের লোহার রডটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
"কী হলো রে ময়না?" রফিক শেখ ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ময়না কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তার চোখের সামনে পুরো জুট মিল এলাকাটা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।
তার মনে হলো, কান ফেটে যাচ্ছে সেই পুরনো বাঁশির শব্দে! মিলের বাঁশি বাজছে... জুট মিলের সেই বিশাল মেশিনগুলো আবার গর্জে উঠেছে! চারিদিকে উড়ছে সোনালী পাটের ধুলো। দূর থেকে মোস্তফা তাকে ডাকছে... ছোট মান্নান আর মরিয়ম হাসতে হাসতে তার দিকে দৌড়ে আসছে...
"ময়না! ময়না!" রফিক শেখ আর অন্য শ্রমিকরা ধরে ফেলার আগেই ময়না জুট মিলের বন্ধ গেটের সামনে, সেই কাদা আর ধুলো মাখা রাস্তার ওপর ঢলে পড়ল।
ঝিমিয়ে পড়া খলিশপুরের আকাশে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসছে। সেই অন্ধকারে কোনো আলো জ্বলল না। জুট মিলের বিশাল চিমনিটা শুধু এক নীরব কাল সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এক নারী শ্রমিকের-আর একটি স্বপ্নের নগরের-করুণ সলিল সমাধির ওপর।
জ/উ