বর্তমান উত্তাল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও নতুন বৈশ্বিক মেরূকরণের মধ্যে ব্রিকসের পথচলা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ধরনের কৌতূহল তৈরি হয়েছে। পাঁচ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে জোটটি নতুন সদস্য গ্রহণের মাধ্যমে ভৌগোলিক পরিধি বাড়ালেও এর ভেতরের ঐক্য ও কার্যকারিতা নিয়ে নানা মত দৃশ্যমান। ইউক্রেন যুদ্ধের দীর্ঘস্থায়িত্ব, ইরান সংঘাত এবং সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে মক্কা চুক্তির মতো নতুন নিরাপত্তা জোট গড়ে ওঠার এই সন্ধিক্ষণে ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে গভীর পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে।
বাহ্যিক দিক থেকে দেখলে চলতি মাসে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব কম নয়। চীন, রাশিয়া, ভারত কিংবা ব্রাজিলের মতো বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তিগুলো যখন এক টেবিলে বসে মতবিনিময় করে, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তা যে ক্রমান্বয়ে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে, ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে রাষ্ট্রপ্রধানদের এই একত্র হওয়া তারই একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা।
বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া এবং পরে ইরানকেন্দ্রিক যুদ্ধের ফলে পশ্চিমের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সুইফট ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা বিশ্ব জুড়ে এক ধরনের নতুন আশঙ্কা তৈরি করেছে। অনেক দেশই এখন তাদের অর্থনীতির ওপর থেকে একতরফা চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থার তাগিদ অনুভব করছে। সেই আলোকেও এই সম্মেলনগুলোর প্রভাব অনস্বীকার্য।
তবে ব্রিকসের মৌলিক বা কৌশলগত বাস্তবায়নের জায়গায় এখনো গভীর মতদ্বৈধতা রয়ে গেছে। ব্রিকস প্রতিষ্ঠার অন্যতম বড় লক্ষ্য বলা হতো মার্কিন ডলারের বিকল্প একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা ডি-ডলারাইজেশন গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবে এটি অত্যন্ত জটিল একটি বিষয়। ১৯৭১ সালে পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকে মার্কিন ডলার বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান মুদ্রা হিসেবে শিকড় গেড়ে বসেছে।
ব্রিকসের মধ্যে চীন তাদের নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শক্তিশালী করতে আগ্রহী হলেও এ জায়গায় ভারতের রয়েছে সরাসরি মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত আপত্তি। ব্রাজিল বা অন্যান্য দেশের ইতিবাচক কিছু অবস্থান থাকলেও সামগ্রিকভাবে ব্রিকসে মুদ্রাভিত্তিক ঐকমত্য তৈরি হয়নি। একইভাবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংঘাত কিংবা কূটনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ফলে রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্রিকসের অবস্থান এখনো একটি একক বা সুদৃঢ় রূপ নিতে পারেনি।
ব্রিকসে যোগ দেওয়া-সংক্রান্ত বিষয়ে একসময় বাংলাদেশে যে প্রবল আলোচনা ও আগ্রহ ছিল, তা বর্তমানে কিছুটা থিতিয়ে গিয়েছে মনে হয়। বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দুটি বাস্তবভিত্তিক কারণ দৃশ্যমান হয়। বর্তমান নীতিনির্ধারকদের কাছে দেশের সার্বিক বৈদেশিক নীতিতে পশ্চিমা বিশ্বই গুরুত্ব পাচ্ছে।
অনেকে মনে করেন, বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার বড় সংকট কিংবা মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব ইউরোপের উত্তপ্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ব্রিকস হয়তো একটি বড় ধরনের মোমেন্টাম বা রাজনৈতিক গতি পাবে। কিন্তু বাস্তবে এর সামনে কিছু শক্ত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। প্রথমত, রাশিয়া বা চীনের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক মডেলকে গ্লোবাল সাউথ বা বিশ্ব রাজনীতিতে কতটা সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতায় রূপ দেওয়া যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
দ্বিতীয়ত, ব্রিকসের দুই অন্যতম শক্তিশালী খুঁটি চীন ও ভারতের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দুই দেশের এই দূরত্বের প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্য খাতগুলোতেও স্পষ্ট। ফলে বৈশ্বিক সংকটের মুখে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তায় ব্রিকসের একটি দৃশ্যমান গতি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও এই অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্যগুলো সেই সম্ভাবনাকে ধীরগতি করে দিচ্ছে।