স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের জটিলতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া হলেও তাদের অনেকের বিপরীতে প্রয়োজনীয় পদ না থাকায় এখন পদায়ন করতে হিমশিম খাচ্ছে বর্তমান সরকার। পদোন্নতি পাওয়ার পরও দায়িত্ব পালনের মতো পদ না থাকায় চিকিৎসকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অটোমেশন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
চিকিৎসকদের পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পদোন্নতির পর পদায়ন না হওয়া এবং যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব না পাওয়ায় চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে পদায়ন প্রক্রিয়াকে ধাপে ধাপে অটোমেশনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের পদায়নের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে অটোমেশনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। তবে এখনো পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আসেনি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসকদের শুধু পদায়ন নয়, কর্মস্থলে উপস্থিতিও অটোমেশনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পদায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়মের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে আগের সময়ে দেওয়া পদোন্নতি নিয়ে। প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দেওয়া হলেও অনেক পদোন্নতির বিপরীতে বাস্তবে কোনো পদ ছিল না। ফলে পদোন্নতি পাওয়া চিকিৎসকদের দায়িত্ব বণ্টন করতে গিয়ে নতুন করে প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতি পেলেও কোথায় এবং কোন পদে দায়িত্ব পালন করবেন- এ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন অনেকে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিপুল হারে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, অথচ অনেক পদোন্নতির বিপরীতে কোনো পদই ছিল না। পদই যদি না থাকে, তবে পদায়ন হবে কীভাবে? পদ না রেখেই পদোন্নতি দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা যে অব্যবস্থাপনা তৈরি করে গেছেন, তার খেসারত আমাদের দিতে হচ্ছে। যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, তারা এখন বলছেন- আমাদের পদোন্নতি তো দিয়েছেন, কিন্তু কাজ করার মতো পদ কোথায়?
স্বাস্থ্য খাতের এই জনবল সংকটের পাশাপাশি চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের পদ থাকলেও অনেক সময় নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায় না। ফলে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। সরকারের পরিকল্পিত অটোমেশন ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামো ও সেবার মান নিয়েও রয়েছে নানা সমস্যা। হাসপাতালে দালালের দৌরাত্ম্য, প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, খাবারের নিম্নমান এবং চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির মতো বিষয়গুলো রোগীদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে। প্রতিটি অব্যবস্থাপনার কারণে একটি শ্রেণি লাভবান হলেও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের সামনে রোগ প্রতিরোধও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই হামের প্রাদুর্ভাব এবং সামনে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগকে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রমও চলছে।
সাপের কামড়ে মৃত্যু কমানো এবং অ্যান্টিভেনমের সরবরাহ নিশ্চিত করাও স্বাস্থ্য বিভাগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে অ্যান্টিভেনম বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। গ্রামাঞ্চলে এর চাহিদা বেশি হলেও ওষুধটি ব্যয়বহুল। দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে ভবিষ্যতে অ্যান্টিভেনম তৈরির সম্ভাবনা যাচাইয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে দেশের ওষুধ শিল্পকে আরও গবেষণামুখী করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের আন্তর্জাতিক সুনাম থাকলেও পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন ওষুধ ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। সরকারি নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোকে গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও পদায়নের জটিলতা, কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, হাসপাতালের সেবার মান বাড়ানো এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার- এই চারটি বিষয়কে সামনে রেখে এগোচ্ছে সরকার। তবে আগের সময়ে পদ না থাকা সত্তে¡ও দেওয়া বিপুলসংখ্যক পদোন্নতির কারণে সৃষ্ট প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত নিরসন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
জ/বা