চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সহযোগী মোহাম্মদ রায়হান এখন আরও বেপরোয়া। চাঁদার দাবিতে তার কাছ থেকে প্রতিদিনই কেউ না কেউ পাচ্ছেন ‘মৃত্যুপরোয়ানা’। ব্যবসায়ী, প্রবাসী, ধনাঢ্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে কেউই বাদ যাচ্ছেন না তার হুমকি-ধমকি থেকে। সবশেষ হাটহাজারীর একজন গরিবদরদি চিকিৎসকের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন রায়হান। চাঁদা না দিলে তাকে ১০০ পুলিশের সামনে হলেও হত্যার হুমকি দিয়েছেন। ইতোমধ্যে রায়হান ও তার বাহিনীর হাতে বেশকিছু হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। চাঁদা না পেয়ে কিংবা আধিপত্য বিস্তারের জেরে নিশানা করে একের পর এক হত্যা করেছেন। তার অন্যতম সহযোগী ডেভিড ইমন, গলাকাটা মোবারক এবং ধামা ইলিয়াস গ্রেফতার হওয়ার পর ধারণা করা হচ্ছিল রায়হান হয়তো এবার কিছুটা দুর্বল হবেন। কিন্তু তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তাকে নিয়ে প্রশাসন বেশ উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেছেন, রায়হানসহ তার সহযোগীরা যদি ভালো হতে চায় তাদের সুযোগ দেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের হয়ে তার অনুসারী ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন, রায়হান আন্ডারওয়ার্ল্ডের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন ও ধামা ইলিয়াসসহ ভয়ংকর সন্ত্রাসীদের অনেকে এখন কারাগারে। ফলে বর্তমানে একক নেতৃত্ব দিচ্ছেন ভয়ংকর সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান। এখন এই সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে বড় বড় ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট সাবেক এমপি, শিল্পপতিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর, বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে টার্গেট ব্যক্তিদের আলটিমেটাম দিয়ে আদায় করা হচ্ছে চাঁদা। যারা চাঁদা দিচ্ছেন না তাদের বাসাবাড়িতে গিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলিবর্ষণ করে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি ঘিরে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গেও তার বাহিনী সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ বাণিজ্য, কন্ট্রাক্ট কিলিংয়েও জড়িয়ে পড়েছে সাজ্জাদ বাহিনী। চট্টগ্রাম মহানগরী ও উত্তর চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তত ২৯টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। যার বেশির ভাগের নেতৃত্বেই ছিল এই সন্ত্রাসী বাহিনী।
গত ১৩ জুন পাহাড়তলী এলাকায় সংঘটিত বহুল আলোচিত মাকসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। পরে ২২ জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মিঠু ওরফে ধামা ইলিয়াসকে গ্রেপ্তার করে দুই দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে ধামা ইলিয়াস সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের মজুত এবং সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করে ২৯ জুলাই যশোরের কোতোয়ালি থানার ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন এদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর এলাকার একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশীয় এলজি ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
ওইদিন শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড রায়হানকে ধরতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অভিযান চালানো হয়। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে রায়হান একটি বাড়ির ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
চট্টগ্রামের হাটহাজারীর গরিবের চিকিৎসক হিসাবে খ্যাত ডা. এম ওয়াই এফ পারভেজের কাছে চাঁদার জন্য সম্প্রতি বিদেশি নম্বর থেকে ফোন দেন রায়হান। ফোন রিসিভ না করায় মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে রোগী সেজে তার চেম্বারে গিয়ে ১০০ পুলিশ থাকলেও গুলি করে হত্যার হুমকি দেন। ডা. পারভেজের বাড়ি হাটহাজারীর চিকনদন্ডি ইউনিয়নে। তিনি হাটহাজারীর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের আমানবাজারে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখেন। এরপর থেকে আবারও আলোচনায় আসেন এই রায়হান। রায়হানের বাড়ি রাউজান উপজেলার পূর্ব রাউজান গ্রামে।
জ/রা