কুড়ির দশক জীবনের নানা ‘প্রথম’ অভিজ্ঞতার সময়। প্রথম চাকরি, প্রথম বেতন, প্রথম বাড়ি ভাড়া, প্রথম ক্রেডিট কার্ড—এর পাশাপাশি এই সময়েই অনেকে প্রথমবার বিনিয়োগের কথাও ভাবতে শুরু করেন। ফলে এ বয়সে অর্থব্যবস্থা যেমন রোমাঞ্চকর মনে হয়, তেমনি অনেকের কাছে তা বিভ্রান্তিরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এক মাসের বেতন হাতে পেয়ে নিজেকে স্বচ্ছল মনে হলেও কয়েক দিন পরই মনে হতে পারে, টাকা এত দ্রুত কোথায় চলে গেল! তবে সম্পদ গড়ার জন্য শুরুতেই বড় অঙ্কের আয় করা জরুরি নয়। বরং অল্প বয়সে এমন কিছু আর্থিক অভ্যাস তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ, যেগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক নিরাপত্তা তৈরিতে সহায়তা করবে।
কুড়ির দশকেই যে অভ্যাসগুলো গড়ে তোলা যেতে পারে, সেগুলো হলো-
বেতন পেলেই আগে সঞ্চয় করুন
মাসের সব খরচ মেটানোর পর অবশিষ্ট টাকা সঞ্চয় করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু মাস শেষে সাধারণত সঞ্চয়ের জন্য খুব বেশি অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। তাই বেতন হাতে পাওয়ার পরই সঞ্চয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো।
আয়ের ১০ বা ২০ শতাংশ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। বেতন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট অর্থ আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা বিনিয়োগে স্থানান্তর করলে অবশিষ্ট অর্থের মধ্যেই জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরি হবে। সঞ্চয়কে ভবিষ্যতের জন্য নিয়মিত একটি মাসিক দায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
কোথায় কত খরচ হচ্ছে, হিসাব রাখুন
বাজেট তৈরির জন্য জটিল স্প্রেডশিট বা বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করতেই হবে এমন নয়। তবে নিজের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
শুরুতে অন্তত এক মাস প্রতিটি খরচ লিখে রাখা যেতে পারে। কফি, খাবার অর্ডার, বিভিন্ন সাবস্ক্রিপশন, কেনাকাটা কিংবা যাতায়াত-ছোট-বড় সব খরচের হিসাব রাখলে অপ্রয়োজনীয় খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তা সহজেই বোঝা যাবে।
আয় বাড়লেই খরচ বাড়াবেন না
বেতন বাড়ার সঙ্গে জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত করা স্বাভাবিক। কিন্তু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচও একই হারে বাড়িয়ে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে।
তাই বেতন বাড়লে খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ানো ভালো। নিজের সাফল্য উপভোগ করার পাশাপাশি প্রতিটি বেতন বৃদ্ধিকে আরও ব্যয়বহুল জীবনযাপনের অভ্যাস তৈরির সুযোগে পরিণত না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
জরুরি তহবিল গড়ে তুলুন
দামি ফোন, বিলাসবহুল পণ্য কিংবা স্বপ্নের ভ্রমণের জন্য কিছু সময় অপেক্ষা করা যায়। কিন্তু অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির জন্য জরুরি তহবিল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হঠাৎ চিকিৎসা ব্যয়, চাকরি পরিবর্তন কিংবা পারিবারিক কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে এই অর্থ মানসিক ও আর্থিক চাপ কমাতে পারে। কয়েক মাসের প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর মতো অর্থ ধীরে ধীরে আলাদা করে রাখার লক্ষ্য নেওয়া যেতে পারে। তহবিলটি এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেখান থেকে প্রয়োজনে সহজে অর্থ পাওয়া যায়।
অল্প হলেও বিনিয়োগ শুরু করুন
অনেকেই মনে করেন, বিনিয়োগ শুরু করতে হলে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। বাস্তবে অল্প অর্থ দিয়েও বিনিয়োগের অভ্যাস তৈরি করা যায়।
কুড়ির দশকে সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময়। নিয়মিত অল্প অল্প করে বিনিয়োগ করলেও দীর্ঘ সময়ে তা বাড়ার সুযোগ থাকে। তাই বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করে শুরু করার অপেক্ষা না করে সামর্থ্য অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব বিনিয়োগের অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রয়োজন আর চাহিদা আলাদা করুন
প্রতিটি কেনাকাটাই যে ভুল, তা নয়। তবে কোনো কিছু কেনার আগে সেটি সত্যিই প্রয়োজনীয় কি না, তা ভেবে দেখা জরুরি।
নিজেকে প্রশ্ন করুন-প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস প্রতিস্থাপন করতে এটি কিনছেন, নাকি শুধু একঘেয়েমি দূর করতে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের কাছে কোনো পণ্য দেখে সেটি কেনার ইচ্ছা হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা দরকার। অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটার আগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার অভ্যাস অনেক সময় কঠোর বাজেটের চেয়েও বেশি অর্থ সাশ্রয় করতে পারে।
বিকল্প আয়ের দক্ষতা তৈরি করুন
নিয়মিত বেতন আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলেও জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ হিসেবে সেটির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল থাকা জরুরি নয়।
কুড়ির দশকে অনেকে ফ্রিল্যান্সিং, শিক্ষকতা, কনটেন্ট তৈরি, পরামর্শ দেওয়া কিংবা ডিজিটাল পণ্য বিক্রির মতো কাজের মাধ্যমে বাড়তি আয় করেন। অতিরিক্ত আয়ের উৎস থাকলে দ্রুত সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করা কিংবা আর্থিক চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।
এর জন্য রাতারাতি ব্যবসা শুরু করার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের মূল পেশার পাশাপাশি আয় করতে সহায়ক দক্ষতা ধীরে ধীরে অর্জন করা যেতে পারে।
ঋণ নেওয়ার আগে শর্ত বুঝুন
সব ঋণ খারাপ নয়। তবে ঋণ নেওয়ার আগে এর শর্ত, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা এবং কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে আর্থিক অবস্থার ওপর কী প্রভাব পড়বে-এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কী পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে, তা আগে বুঝে নেওয়া জরুরি। কোনো কেনাকাটার আনন্দ যাতে পরবর্তী কয়েক মাসের আর্থিক বোঝায় পরিণত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত।
টাকা নিয়ে কথা বলতে সংকোচ করবেন না
বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক, চাকরি কিংবা ভ্রমণ নিয়ে আলোচনা হলেও অর্থসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অনেকেই কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তবে বেতন, বিনিয়োগ, কর ও আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে স্বাস্থ্যকর আলোচনা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছু শেখা সম্ভব।
নিজের আর্থিক অবস্থার প্রতিটি তথ্য অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান বিনিময়ের মানসিকতা থাকলে অন্যের কাছ থেকে এমন অনেক কিছু শেখা যায়, যা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
কুড়ির দশকে গড়ে তোলা এসব অভ্যাস তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো পরিবর্তন না আনলেও সময়ের সঙ্গে আর্থিক স্থিতিশীলতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জ/উ