কোরআন-হাদিসের দোয়াসংবলিত তাবিজ ব্যবহারের বিধান কী?

ধর্ম ডেস্ক

ইসলাম ও জীবন

2026-10-18T15:28:21+06:00
2026-10-18T15:28:21+06:00
রোববার ● ১৮ অক্টোবর ২০২৬,
২ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
ইসলাম ও জীবন
কোরআন-হাদিসের দোয়াসংবলিত তাবিজ ব্যবহারের বিধান কী?
ধর্ম ডেস্ক
⏲ ৩:২৮ পিএম | ১৮ অক্টোবর, ২০২৬ | রোববার
সংগৃহীত ছবি
মানুষের জীবনে নানা ধরনের বিপদ-আপদ, অসুস্থতা, ভয় ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। এসব পরিস্থিতিতে স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সুস্থতার আশায় মানুষ মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। কেউ কোরআন তিলাওয়াত করেন, কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়া ও জিকির পাঠ করেন, আবার কেউ কোরআনের আয়াত ও মাসনুন দোয়াসংবলিত তাবিজ ব্যবহার করেন।

ইসলামে শিরক, কুসংস্কার ও অবৈধ পন্থা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর কালাম, তাঁর সুন্দর নামসমূহ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো দোয়ার মাধ্যমে তাঁর কাছে আশ্রয় ও সাহায্য চাওয়ার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করি, যা মুমিনদের জন্য শিফা ও রহমত।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৮২)

সাধারণভাবে কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম, হাদিসে বর্ণিত দোয়া কিংবা অর্থবোধক প্রার্থনা লিখে কাগজ বা অন্য কোনো উপকরণে সংরক্ষণ করে শরীরে ধারণ করাকে তাবিজ বলা হয়। তবে তাবিজের বিষয়বস্তু, ব্যবহারের ধরন ও উদ্দেশ্য অনুসারে এর শরয়ি বিধান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।

তাবিজের ধরন ও শরয়ি বিধান

১. কোরআনের আয়াত ও বৈধ দোয়াসংবলিত তাবিজ

এ ধরনের তাবিজে কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম কিংবা শরিয়তসম্মত দোয়া লেখা থাকে। কিছু আলেম নির্দিষ্ট শর্তে এ ধরনের তাবিজ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। অন্যদিকে, একদল আলেম সাধারণ নিষেধাজ্ঞার দলিলের ভিত্তিতে কোরআনের আয়াত লেখা তাবিজও পরিহার করার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাই এ বিষয়ে এককভাবে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত রয়েছে—এমন দাবি করা ঠিক নয়।

২. অজ্ঞাত শব্দ, সংখ্যা ও দুর্বোধ্য চিহ্নসংবলিত তাবিজ

এ ধরনের তাবিজে এমন শব্দ, সাংকেতিক চিহ্ন, সংখ্যা বা মন্ত্র থাকতে পারে, যার অর্থ ও উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। এগুলোর মধ্যে শিরকি বক্তব্য, প্রতারণা কিংবা কুসংস্কারের উপাদান থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এসব তাবিজ থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে শিরক বা কুফরি বক্তব্য থাকলে তা ব্যবহার করা বৈধ নয়।

৩. শিরকি ও কুফরি বক্তব্যসংবলিত তাবিজ

যেসব তাবিজে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে ইবাদতসুলভ প্রার্থনা, শিরকি আহ্বান কিংবা ইসলামের মৌলিক আকিদাবিরোধী বক্তব্য থাকে, সেগুলো ব্যবহার করা হারাম। মুসলমানের জন্য এ ধরনের তাবিজ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা আবশ্যক।

হাদিসে ঝাড়ফুঁক ও দোয়ার বিধান

সহিহ মুসলিমে হজরত আউফ ইবনে মালিক আল-আশজায়ি (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, জাহেলি যুগে তাঁরা ঝাড়ফুঁক করতেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের ঝাড়ফুঁকের পদ্ধতিগুলো আমার সামনে উপস্থাপন করো। ঝাড়ফুঁকে শিরক না থাকলে তাতে কোনো অসুবিধা নেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২০০)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, শিরকমুক্ত রুকইয়াহ বা ঝাড়ফুঁক বৈধ। কোরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম এবং শরিয়তসম্মত দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সুস্থতা ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করা যায়।

তবে রুকইয়াহর বৈধতা থেকে লিখিত তাবিজের সব পদ্ধতি বৈধ—এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। কারণ দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং দোয়া লিখে শরীরে ঝুলিয়ে রাখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। লিখিত তাবিজের বিধান নির্ধারণে এ বিষয়ে বর্ণিত অন্যান্য হাদিস ও ফিকহবিদদের ব্যাখ্যাও বিবেচনা করতে হয়।

তাবিজ সম্পর্কে হাদিস ও আলেমদের বক্তব্য

সুনানে আবু দাউদে আমর ইবনে শুআইব (রহ.) তাঁর পিতা ও দাদার সূত্রে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন। এতে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ভীতিকর পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার একটি দোয়া শিক্ষা দিতেন। দোয়াটির অর্থ হলো, ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে তাঁর ক্রোধ, তাঁর বান্দাদের অনিষ্ট, শয়তানদের কুমন্ত্রণা এবং তাদের আমার কাছে উপস্থিত হওয়া থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’

বর্ণনার পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) তাঁর যেসব সন্তান দোয়াটি বুঝতে পারত, তাদের তা শেখাতেন। আর যারা বুঝতে পারত না, তাদের জন্য দোয়াটি লিখে ঝুলিয়ে দিতেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৮৯৩)

এ বর্ণনাকে কিছু আলেম কোরআন ও বৈধ দোয়াসংবলিত তাবিজের অনুমতির পক্ষে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে এ বিষয়ে অন্যান্য হাদিস ও আলেমদের ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে।

ফিকহের কিছু গ্রন্থেও নির্দিষ্ট শর্তে কোরআনের আয়াত ও আল্লাহর নামসংবলিত তাবিজ ব্যবহারের অনুমতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘রদ্দুল মুহতার’ গ্রন্থে এ বিষয়ে অনুমতিসূচক বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে (৯/৫২৩)। তবে উদ্ধৃতিটির সঠিক পাঠ ও সংস্করণ প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।

তাবিজ ব্যবহারে কোন বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ?

কোরআন-হাদিসের দোয়াসংবলিত তাবিজের অনুমতির পক্ষে মত দেওয়া আলেমরা সাধারণত কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করেন:

১. তাতে আল্লাহর বাণী, তাঁর নাম ও গুণাবলি অথবা শরিয়তসম্মত দোয়া থাকতে হবে।

২. তাতে কী লেখা হয়েছে, তা স্পষ্টভাবে জানা থাকতে হবে এবং কোনো শিরকি বা নিষিদ্ধ বক্তব্য থাকা যাবে না।

৩. বিশ্বাস রাখতে হবে, তাবিজ নিজস্ব ক্ষমতায় কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না; সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন।

এসব শর্ত উল্লেখ করা হলেও মনে রাখতে হবে, এগুলো তাবিজের অনুমতির পক্ষে মত দেওয়া আলেমদের ব্যাখ্যা। সব আলেম লিখিত তাবিজ ব্যবহারের বিষয়ে একমত নন।

সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি কোনটি?

বিপদ-আপদ, অসুস্থতা ও দুশ্চিন্তার সময় সরাসরি আল্লাহর কাছে দোয়া করা, কোরআন তিলাওয়াত করা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো মাসনুন দোয়া ও শিরকমুক্ত রুকইয়াহর মাধ্যমে সাহায্য চাওয়া সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে চিকিৎসা গ্রহণ করাও জরুরি।

অন্যদিকে, তাবিজের বিষয়বস্তু অজানা হলে কিংবা তাতে শিরকি বক্তব্য থাকার আশঙ্কা থাকলে তা ব্যবহার করা উচিত নয়। কোরআন ও বৈধ দোয়াসংবলিত লিখিত তাবিজের বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় নিজের অনুসৃত মাজহাব ও নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

সর্বোপরি, মুমিনের ভরসা থাকবে একমাত্র মহান আল্লাহর ওপর। কোনো বস্তু বা পদ্ধতিকে আল্লাহর স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী মনে করা ইসলামের আকিদার পরিপন্থী।

জ/শা 


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত