চাঁদা চেয়ে ফোন, এরপর হুমকি। টাকা না দিলে অফিসে হামলা, ভাঙচুর, ককটেল বিস্ফোরণ কিংবা বাসা লক্ষ্য করে গুলি। কখনো দাবির অঙ্ক লাখে, কখনো কোটি টাকা। ২০২৪ সালের আগস্টের পর প্রকাশিত বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে চাঁদাবাজির অভিযোগে সহিংসতার এমন ধারাবাহিক চিত্রই সামনে এসেছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম—ব্যবসায়ী, ডেভেলপার, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থেকে আবাসিক ভবনও বাদ যাচ্ছে না। সর্বশেষ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের অফিসে ঢুকে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর নবীনগর হাউজিং এলাকায় ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল অফিসে ঢুকে টাকা দাবি করে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
দাবিতে রাজি না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ইমরানকে মারধর এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাম হাতের কবজিতে জখম করার অভিযোগ রয়েছে। পরে অভিযানে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারদের পাঁচজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় আগের মামলা থাকার তথ্যও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে ঢাকার এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। মোহাম্মদপুরেই ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে ছয়জনকে ধারালো অস্ত্রসহ গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছিল আইএসপিআর।
চাঁদার সঙ্গে গুলির যোগ : চট্টগ্রামে গত দুই বছরে চাঁদাবাজির অভিযোগে গুলি ও হামলার একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের আগস্টে পাঁচলাইশের হামজারবাগে একটি আবাসিক ভবনের গেটে গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবন মালিকের প্রবাসী ছেলের কাছে আগে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
এর আগে ২০২৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামে এক শীর্ষ ব্যবসায়ীর বাসা লক্ষ্য করে দুই দফা গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাঁচ কোটি টাকা চাঁদা না দেওয়ার সঙ্গে হামলার যোগসূত্রের অভিযোগ এসেছে।
শুধু বাসা নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ১৩ জুলাই চট্টগ্রামের ডিজিটাল ডট নেটের (ডিডিএন) অফিসে সশস্ত্র হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলার আগে এককালীন দুই কোটি টাকা এবং পরবর্তী সময়ে মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। হামলার সময় নগদ ৩৫ লাখ টাকা লুটের অভিযোগও করা হয়।
ককটেল থেকে গুলি : জুলাইয়ের শেষদিকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগ ওঠে। ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিনের দাবি, দেশি-বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে ২০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হচ্ছিল। টাকা না দেওয়ার পরই হামলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
চাঁদাবাজির অভিযোগে সহিংসতার ব্যাপ্তি নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের এক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরীর কয়েকটি এলাকায় চাঁদার দাবিতে প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার একাধিক ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ২৫টি স্থানে গুলি ছোড়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
হুমকি থেকে হামলা : রাজধানীর মোহাম্মদপুরেও চাঁদা না পেলে হামলা, লুট ও কুপিয়ে জখমের একাধিক অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে একাধিকবার গ্রেপ্তার এবং পরে জামিনে বেরিয়ে ফের অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
প্রকাশিত ঘটনাগুলোর ধরন বলছে, চাঁদাবাজির অভিযোগ এখন শুধু টাকা আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অফিসে ঢুকে হামলা, অস্ত্রের ব্যবহার, বাসায় গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ও ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। কোথাও এককালীন কোটি টাকা, কোথাও আবার মাসিক চাঁদার দাবি।
গত ২০২৪ সালের আগস্টের পরের ঘটনাগুলোতে তাই একটি প্রবণতা স্পষ্ট—চাঁদার টাকা না দিলে হুমকি থেকে হামলায় রূপ নেওয়ার অভিযোগ বাড়ছে, আর হামলার লক্ষ্য হয়ে উঠছে মানুষের কর্মস্থল ও বসতবাড়ি দুটিই। তবে এগুলো বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা; পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নয়। ফলে এ তথ্য দিয়ে সারাদেশে চাঁদাবাজির মোট ঘটনার সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।
জ/শা