ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভ করা স্বাভাবিক ও বৈধ। একজন ব্যবসায়ী পণ্য কিনে তা লাভে বিক্রি করবেন-এটাই ব্যবসার প্রচলিত নিয়ম। ইসলামও বৈধ ব্যবসা ও হালাল উপার্জনকে অনুমোদন করেছে। তবে মুনাফার আকাঙ্ক্ষা যখন সীমাহীন লোভে পরিণত হয়, তখন তা মানুষের নৈতিকতা ও বিবেককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। পণ্যের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়ানো, কৃত্রিম সংকট তৈরি, পণ্য মজুত করে রাখা কিংবা মানুষের প্রয়োজন ও অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতার বিরুদ্ধে কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনে মাপ ও ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। সূরা মুতাফফিফিনের শুরুতেই আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়।’ এরপর বলা হয়েছে, তারা যখন মানুষের কাছ থেকে মেপে নেয়, তখন পূর্ণমাত্রায় নেয়; কিন্তু যখন মানুষকে মেপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। (সূরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১-৩)
আয়াতগুলো মূলত মাপ ও ওজনে প্রতারণাকারীদের বিষয়ে নাজিল হলেও এর শিক্ষা ব্যবসায়িক সততার বৃহত্তর নীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত। নিজের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা, অথচ অন্যের প্রাপ্য দেওয়ার সময় কারচুপি করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিন্দনীয়।
কোরআনের আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮) এ নির্দেশনা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতার গুরুত্ব তুলে ধরে। মানুষের প্রয়োজন, অসহায়ত্ব কিংবা অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জন এই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ইসলামে মুনাফা অর্জন নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল পথে উপার্জনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে সেই লাভ যদি প্রতারণা, মজুতদারি, ভেজাল, মিথ্যা তথ্য বা অন্যের অসহায়ত্বকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে অর্জিত হয়, তখন তা নৈতিকতার প্রশ্ন তৈরি করে। একজন ব্যবসায়ী পণ্যের প্রকৃত মান, ত্রুটি ও মূল্য সম্পর্কে ক্রেতাকে সঠিক তথ্য দিয়ে ব্যবসায়িক আমানতদারি রক্ষা করতে পারেন।
কোরআনে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘তোমরা ন্যায়ের সঙ্গে পরিমাপ প্রতিষ্ঠা করো এবং ওজনে কম দিয়ো না।’ (সূরা আর-রহমান, আয়াত:৯) এই আয়াত ব্যবসায়িক লেনদেনে ভারসাম্য ও ন্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে। শুধু বাজারের কেনাবেচায় নয়, জীবনের প্রতিটি লেনদেনেই অন্যের অধিকার যথাযথভাবে দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে এতে।
মুনাফার অতিরিক্ত লোভ মানুষকে কখনো এমন অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে সাময়িক আর্থিক লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস ও সামাজিক দায়িত্বকে উপেক্ষা করা হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি সেই সম্পদ অর্জনের পদ্ধতিও পবিত্র ও ন্যায়সংগত হতে হবে।
একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর কাছে ক্রেতার আস্থা, ন্যায্যতা ও আল্লাহর কাছে জবাবদিহির অনুভূতি গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। মানুষের চোখ এড়িয়ে কোনো অনিয়ম করা সম্ভব হলেও আল্লাহর কাছ থেকে কিছুই গোপন থাকে না—এ বিশ্বাস ব্যবসায়িক সততার ভিত্তি তৈরি করে। তাই মুনাফার সঙ্গে সততা, আমানতদারি ও ন্যায়পরায়ণতাকে যুক্ত করাই কোরআনের অর্থনৈতিক শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
জ/উ