স্ত্রীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য আচরণ

ধর্ম ডেস্ক

ইসলাম ও জীবন

ভালোবাসা কেবল মুখের কথায় প্রকাশ পায় না; বরং আচরণ, সহনশীলতা, সহযোগিতা এবং ছোট ছোট যত্নের মাধ্যমেই এর প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দাম্পত্য জীবনে এর গুরুত্ব আরও বেশি। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাকস্বরূপ—তারা পরস্পরের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তির আশ্রয়।

2026-09-17T19:03:41+06:00
2026-09-17T19:03:41+06:00
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইপেপার  বাংলা English
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Advertisement
ইসলাম ও জীবন
স্ত্রীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য আচরণ
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৩ পিএম 
স্ত্রীদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য আচরণ
ভালোবাসা কেবল মুখের কথায় প্রকাশ পায় না; বরং আচরণ, সহনশীলতা, সহযোগিতা এবং ছোট ছোট যত্নের মাধ্যমেই এর প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দাম্পত্য জীবনে এর গুরুত্ব আরও বেশি। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের পোশাকস্বরূপ—তারা পরস্পরের শান্তি, নিরাপত্তা ও মানসিক প্রশান্তির আশ্রয়।

ইসলামে বিয়ে শুধু একটি সামাজিক সম্পর্ক নয়; এটি দায়িত্ব, অধিকার, ভালোবাসা ও দয়া-সহানুভূতির ওপর প্রতিষ্ঠিত পবিত্র বন্ধন। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)

এই আয়াত দাম্পত্য জীবনের একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। স্ত্রীকে সম্মান করা, তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া, ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা এবং সাধ্য অনুযায়ী তার প্রয়োজন পূরণ করা—সবই সদ্ভাবে জীবনযাপনের অংশ।

এই নির্দেশনার বাস্তব ও সুন্দর দৃষ্টান্ত ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। তিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল, রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষক ও উম্মতের পথপ্রদর্শক। বিপুল দায়িত্বের মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের অধিকার, অনুভূতি ও প্রয়োজনের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল।

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন। আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাম্পত্য জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, পরিবারের কাজে সহযোগিতা করাকে তিনি নিজের মর্যাদার পরিপন্থী মনে করতেন না। হজরত আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, নবী (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বলেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারের কাজে নিয়োজিত থাকতেন।’ (সহিহ বুখারি)

অর্থাৎ, পরিবারের দায়িত্ব শুধু একজনের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী পরস্পরকে সহযোগিতা করা দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্য বাড়ায়।

দাম্পত্য সম্পর্ক সুন্দর রাখতে অর্থ-সম্পদের পাশাপাশি প্রয়োজন সময়, মনোযোগ ও আন্তরিক কথোপকথন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলতেন, তাঁদের কথা শুনতেন এবং অনুভূতির প্রতি গুরুত্ব দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ কথোপকথনের ঘটনাও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

এ থেকে বোঝা যায়, পরিবারের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো কোনো তুচ্ছ বিষয় নয়। বরং আন্তরিক আলাপ ও মনোযোগ দাম্পত্য সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।

আজ অনেক পরিবারে একই ছাদের নিচে থেকেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। একে অপরের সঙ্গে কথা বলা কিংবা মনের কথা শোনার সময় হয়ে ওঠে না। অথচ সুন্দর একটি কথা, কিছুটা সময় দেওয়া কিংবা মনোযোগ দিয়ে জীবনসঙ্গীর কথা শোনা অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, তবে তাঁর পারিবারিক জীবন আনন্দহীন ছিল না। তিনি স্ত্রীদের বৈধ আনন্দ ও বিনোদনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিতেন।

হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর দৌড় প্রতিযোগিতার ঘটনা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। একবার আয়েশা (রা.) দৌড়ে তাঁকে পরাজিত করেন। পরবর্তী সময়ে আবার দৌড় প্রতিযোগিতা হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে ছাড়িয়ে যান এবং মজার ছলে আগের ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। (সুনান আবু দাউদ)

রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আয়েশা (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতার অনেক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, তিনি যে পাত্র থেকে পান করতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই পাত্রের একই স্থান থেকে পান করতেন। তিনি যে হাড় থেকে মাংস খেতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও সেই একই স্থান থেকে খেতেন। (সহিহ মুসলিম)

ঈদের দিন মসজিদে হাবশিদের বর্শা-খেলা প্রদর্শনের ঘটনাও হাদিসে এসেছে। হজরত আয়েশা (রা.) সেই খেলা দেখতে চেয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে তা দেখার সুযোগ দেন এবং তিনি সন্তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত তাঁর জন্য অপেক্ষা করেন। (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

স্ত্রীদের মধ্যে স্বাভাবিক ঈর্ষা বা অভিমান প্রকাশ পেলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তা ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে মোকাবিলা করতেন। প্রতিটি পরিস্থিতিতে তিনি উত্তেজিত হয়ে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতেন না।

এখানে স্বামীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—জীবনসঙ্গীও একজন মানুষ। তাঁরও আবেগ, অভিমান, ভালো লাগা ও কষ্ট রয়েছে। তাই প্রতিটি ভুলকে অপরাধ হিসেবে না দেখে কখনো কখনো মানবিক দুর্বলতা হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।

তবে এর অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। ইসলাম যেমন সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে, তেমনি ন্যায় ও আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষারও নির্দেশ দিয়েছে। প্রয়োজন হলে ভুল সংশোধন করতে হবে; তবে সেই সংশোধনের পদ্ধতিতেও থাকতে হবে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও ন্যায়পরায়ণতা।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান নয়। তুমি মন্দকে প্রতিহত করো যা উত্তম তা দিয়ে। এ গুণ শুধু তারাই লাভ করে, যারা ধৈর্য ধারণ করে।’ (সুরা : ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৪-৩৫)

রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের পাশাপাশি তাঁদের অধিকার রক্ষায় ন্যায়বিচারও করতেন। একাধিক স্ত্রী থাকায় তিনি সময় ও পালার ক্ষেত্রেও ন্যায় বজায় রাখতেন।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের কাছে যেতেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন এবং যার পালা ছিল, তাঁর কাছে রাতযাপন করতেন। (সুনান আবু দাউদ)

সংসারে সুখী হতে হলে স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই একে অপরের ভুলত্রুটি সহ্য করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। মানুষ মাত্রই ভুল করে। স্বামী যেমন ভুল করতে পারেন, স্ত্রীও তেমনি ভুল করতে পারেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)

বাইরের মানুষের সামনে হাসিমুখে থাকা তুলনামূলক সহজ হলেও দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীর সঙ্গে ধৈর্য, সম্মান ও ভালোবাসা নিয়ে চলাই চরিত্রের বড় পরীক্ষা। তাই ঘরেই মানুষের উত্তম চরিত্রের প্রকৃত প্রকাশ ঘটে।

স্ত্রীর সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলা, তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, প্রয়োজনে ঘরের কাজে সহযোগিতা করা, তাঁর পছন্দকে সম্মান করা, ভুলত্রুটি ক্ষমা করা, বৈধ আনন্দে অংশ নেওয়া এবং রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা—এসব আচরণ দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা ও সৌন্দর্য বাড়ায়।

একইভাবে স্ত্রীও স্বামীর প্রতি সম্মান, সহযোগিতা, ভালোবাসা ও সদ্ব্যবহার করবেন। কারণ কোরআন দাম্পত্য সম্পর্ককে একতরফা অধিকার হিসেবে দেখেনি; বরং পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নারীদেরও ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমন তাদের ওপর ন্যায়সংগত দায়িত্ব রয়েছে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২২৮)

তাই মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন থেকে শিক্ষা হলো—সংসারে ভালোবাসার পাশাপাশি প্রয়োজন ধৈর্য, পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতা। পরিবারে উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচরণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য জীবন গড়ে উঠতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারে উত্তম চরিত্র, ভালোবাসা, দয়া ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জ/শা 





  বিষয়:   ইসলাম  মহানবী (সা.)  স্বামী-স্ত্রী  দাম্পত্য জীবন 



Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম ও জীবন - আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
বার্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগ : প্রকাশক কর্তৃক ৮২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক (৩য় তলা) ওয়্যারলেস মোড়, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
বার্তা বিভাগ : +8802-58316172, বাণিজ্যিক বিভাগ : +8802-58316175, E-mail: [email protected] , [email protected]