বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, কার্বন ক্রেডিটের পথে বাংলাদেশ

জবাবদিহি ডেস্ক

জাতীয়

2026-09-10T19:28:16+06:00
2026-09-10T19:28:16+06:00
বৃহস্পতিবার ● ২৯ অক্টোবর ২০২৬,
১৩ কার্তিক ১৪৩৩
Advertisement
জাতীয়
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, কার্বন ক্রেডিটের পথে বাংলাদেশ
জবাবদিহি ডেস্ক
⏲ ৭:২৮ পিএম | ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বৃহস্পতিবার
সংগৃহীত ছবি
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের। ঢাকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিলে বাস্তবায়নাধীন দেশের প্রথম বড় আকারের বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেই এ সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে ঢাকার বিশাল বর্জ্য সমস্যার টেকসই সমাধান হবে, অন্যদিকে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানোর স্বীকৃতিও পাবে বাংলাদেশ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। ল্যান্ডফিলের বর্জ্য ব্যবহার করে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের সঙ্গে ইতোমধ্যে অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, পরিবেশ বিভাগ, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সম্মতিতে চুক্তিটি সই হয়। ২০২৮ সালে প্রকল্পটি থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমিনবাজারের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পকে শুধু ২৫ টাকা দরে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যাবে না। এটি একই সঙ্গে ঢাকার বর্জ্য সংকট, ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, জ্বালানি উৎপাদন এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কার্বন অর্থনীতির একটি পরীক্ষাগার।

তাদের মতে, আমিনবাজার ল্যান্ডফিল ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশনের বছরে প্রায় ৫২০ কোটি টাকা খরচ হয়। চীন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করায় সিটি করপোরেশনকে এ অর্থ ব্যয় করতে হবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ৯০ কোটি টাকার কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, এ প্রকল্পে চীনের সরাসরি বিনিয়োগ হচ্ছে ৬ হাজার কোটি টাকা। চীনের সিএমইসি গ্রুপের উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অর্থায়নের সঙ্গে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ডিবিএস, এনডিবি এবং ব্যাংক অব চায়নাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্ত রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সবাই দাম নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু এখানে শেষ পর্যন্ত দাম দাঁড়াবে ১০ টাকার নিচে। সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশ কার্বন ক্রেডিট পাবে।’

কার্বন ক্রেডিট পরিবেশ সুরক্ষার একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা ও সনদ। এটি বায়ুমণ্ডলে এক মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন কমানো কিংবা অপসারণের স্বীকৃতি দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে একটি কার্বন ক্রেডিটের অর্থ হলো এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বা সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বাতাসে মিশতে না দেওয়া। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এ ক্রেডিটের সুবিধাভোগী হবে।

সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে দেশের কার্বন ক্রেডিট বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রয়োগ, জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়ন, বন সংরক্ষণ এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কার্বন শোষণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চীনের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতার কথাও তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশটি সরাসরি উচ্চ তাপমাত্রায় বর্জ্য পোড়ানোর প্রযুক্তিতে সক্ষমতা তৈরি করেছে। চীনের উদ্ভাবিত ইনসিনারেটর গ্রেট ব্যবস্থা উচ্চ আর্দ্রতাসম্পন্ন বর্জ্যও উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

অন্যদিকে, আরডিএফ (রিফিউজ-ডেরিভড ফুয়েল) এবং বায়োমেথানেশনের নিজস্ব মডেল তৈরিতেও চীন জোর দিয়েছে। সরাসরি পোড়ানোর পরিবর্তে বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক ও কাগজ আলাদা করে ফুয়েল পেলেট তৈরি কিংবা পচনশীল বর্জ্য থেকে মিথেন গ্যাস উৎপাদনের প্রযুক্তিও তারা ব্যবহার করে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এ প্রকল্পে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশগত আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ল্যান্ডফিলে জৈব বর্জ্য পচলে মিথেন তৈরি হয়। সেই জৈব বর্জ্য ল্যান্ডফিলে না পাঠিয়ে নিয়ন্ত্রিত ডাইজেস্টারে নেওয়া হলে মিথেন ধরে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। এতে একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প তৈরি হবে, অন্যদিকে ল্যান্ডফিল থেকে অনিয়ন্ত্রিত মিথেন নিঃসরণ কমানো যাবে।

এ কারণেই কার্বন অর্থনীতির সঙ্গে বায়োগ্যাস প্রকল্পের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা। এখান থেকেও কার্বন ক্রেডিট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রকল্পটি প্রচলিত ল্যান্ডফিল ব্যবস্থার তুলনায় কত টন কার্বন-সমতুল্য নির্গমন কমাচ্ছে, তা পরিমাপ, প্রতিবেদন এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করতে হবে। প্রতি টন যাচাইকৃত নির্গমন হ্রাসের বিপরীতে কার্বন ক্রেডিট তৈরি হতে পারে।

তবে এ থেকে কত অর্থ পাওয়া যাবে, তা আগেভাগে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। ক্রেডিটের মান, বাজার পরিস্থিতি, প্রকল্পের পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক নিয়মের ওপর এর মূল্য নির্ভর করবে।

জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী, সরকারকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন যে, কার্বন ট্রেডিং নিয়ে সরকার ইতিবাচক চিন্তা করছে।’

তিনি বলেন, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য থেকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে না, এর ফলে দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা তৈরি হবে। কাঁচা বর্জ্য থেকে যে পরিমাণ দুর্গন্ধ ও দূষণ হয়, সেসব থেকে শহর মুক্তি পাবে। এখানে কার্বন অ্যাবজর্ভ হয়ে মিথেনের ব্যবহারে পরিবেশ কম দূষিত হবে এবং একটি আধুনিক শহরের মডেল তৈরি হবে।

ড. আইনুন নিশাত আরও বলেন, এ প্রকল্পে চীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং চালু করবে, যা খুবই আশাব্যঞ্জক। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও কার্বন ট্রেডিং নিয়ে নতুন পরিকল্পনা করছে। প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে এসব কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা থেকে সরকারের পরিকল্পনা সুদূরপ্রসারী বলে বোঝা যায়। এখন এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি।

জ/উ



Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
সর্বাধিক পঠিত
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত