বাংলাদেশের বিনোদন অঙ্গনে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী তমা মির্জার নতুন পেশাগত পরিচয় নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবি ব্যাংকের ব্র্যান্ড অ্যান্ড কমিউনিকেশনস বিভাগে অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট (এভিপি) হিসেবে তার যোগ দেওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্যাংকিং অঙ্গনে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
ব্যাংকিং বা করপোরেট খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তমা মির্জার এভিপি পদে যোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তি জানিয়ে পোস্ট করেন সঞ্চালক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয়।
জয় তার পোস্টে লেখেন, ‘তমা মির্জাকে যদি ব্যাংকে চাকরি নিতে হয়, তাহলে অন্য অনেক নায়িকাদের গার্মেন্টসে চাকরি নেওয়া উচিত।’ একই সঙ্গে তার মন্তব্য ছিল, এর মাধ্যমে যারা নায়িকা হতে চান, তাদের আগে চাকরি করে পরে পার্টটাইম নায়িকা হওয়ার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
জয়ের মন্তব্যের জবাব দেন তমা মির্জা। নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দীর্ঘ অভিনয়জীবনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘এলএলবি কমপ্লিট করা একটা মেয়ে ১৬ বছর যখন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আছে, তখন এমন প্রশ্ন কেউ করেনি। কেউ মিডিয়াতে কাজ করে বলে সে আর কোনো প্রফেশনে যেতে পারবে না; এটা বললে তো আপনি দুই প্রফেশনকেই ছোট করলেন।’
জয়ের কনটেন্ট ক্রিয়েশনের প্রসঙ্গ টেনে তমা আরও বলেন, ‘শিক্ষিত ও প্রগতিশীল মানুষের মুখে এটা মানায় না। আমি এখন অভিনেত্রীর পাশাপাশি একজন ব্যাংকার এবং এটা নিয়ে আমি গর্বিত।’
পরে তমার বক্তব্যের প্রশংসা করে জয় তাকে অভিনন্দন জানান। একই সঙ্গে তাদের এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের ঘটনাকে মজার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এভিপি পদে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
তমা মির্জার নিয়োগের পর ব্যাংকিং খাতের পদোন্নতি ও নিয়োগের যোগ্যতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণভাবে একটি ব্যাংকের এভিপি পর্যায়ের পদে দায়িত্ব পালনের জন্য ৮ থেকে ১০ বছরের ধারাবাহিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয় বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।
অভ্যন্তরীণ পদোন্নতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ‘ব্যাংকিং ডিপ্লোমা’র দুই পর্বে উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে সরাসরি বা ল্যাটারাল এন্ট্রির ক্ষেত্রে প্রার্থীর ৮ থেকে ১২ বছরের প্রাসঙ্গিক করপোরেট অভিজ্ঞতা থাকা বাঞ্ছনীয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক তমা মির্জার করপোরেট কমিউনিকেশন বা ব্র্যান্ডিং খাতে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১৬ বছর ধরে তিনি মূলত অভিনয় পেশার সঙ্গেই যুক্ত। এ কারণে তার নিয়োগ নিয়ে ব্যাংকিং খাতে বিস্ময় ও প্রশ্নের কথা উঠে এসেছে।
এবি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা
তমা মির্জার নিয়োগ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি এবি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতিও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও সাম্প্রতিক ফরেনসিক অডিটের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ব্যাংকটির আর্থিক দুর্বলতা ও তারল্য সংকটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৮৪ শতাংশ। এ ছাড়া সম্প্রতি ব্যাংকটির নিট লোকসান ৩ হাজার ১১৩ কোটি টাকা, প্রভিশন ঘাটতি ১৬ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা এবং মূলধন ঘাটতি ৪ হাজার ২৯৮ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
একাধিক ব্যাংক কর্মকর্তার মতে, আর্থিক সংকটের কারণে যেখানে ব্যাংকটির অনেক যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তার পদোন্নতি দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে, সেখানে পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া একজন অভিনয়শিল্পীকে এভিপি পদে নিয়োগের বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
নিয়োগ নিয়ে কী বলছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা
তমা মির্জার নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এবি ব্যাংকের জন্য নিযুক্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসাইন খান এ নিয়োগের মানদণ্ড সম্পর্কে অবগত নন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি নিয়োগের বিষয়টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকেও জানানো হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, ব্যাংকের প্রতিটি পদের জন্য সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা প্রয়োজন এবং ইচ্ছামতো কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট ও অভিন্ন নীতিমালা না থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সেই সুযোগেই এ নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
তবে নতুন করপোরেট পেশায় যুক্ত হলেও অভিনয় ছাড়ার পরিকল্পনা নেই তমা মির্জার। তার ভাষ্য, অভিনয়ই তার প্রথম ভালোবাসা এবং তিনি নিয়মিত অভিনয় চালিয়ে যাবেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও তার অভিনয়ের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানা গেছে।
অভিনয় ক্যারিয়ারে আফরান নিশোর বিপরীতে ‘সুড়ঙ্গ’ ও ‘দাগি’ এবং ওটিটিতে ‘জানোয়ার’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ ও ‘ফ্রাইডে’র মতো কনটেন্টে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন তমা। বছরে একটি-দুটি মানসম্মত কাজ করার লক্ষ্য রয়েছে তার। শিগগিরই ভিকি জাহেদের পরিচালনায় ‘খলনায়ক’ সিনেমায় আবারও আফরান নিশোর বিপরীতে বড় পর্দায় দেখা যাবে তাকে।
জ/উ