কুমিল্লায় কিশোরী জান্নাতুন তাজমীন (১৫) হত্যা মামলার আলোচিত ব্যক্তি রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরীকে ঘিরে কক্সবাজারে এক দিনের ব্যবধানে ঘটেছে নাটকীয় ঘটনা। স্থানীয় লোকজনের হাতে আটক হওয়ার পর ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে আবার কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ফেরত দেওয়া হয়। পরে থানা-পুলিশ তাঁকে আদালতে সোপর্দ করে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) এসব ঘটনা ঘটে। তাজমীন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কুমিল্লা জেলা ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার অধিযাচনপত্রের মাধ্যমে রাজুকে নিজেদের হেফাজতে নেন। তাজমীনের সঙ্গে তাঁর পূর্বপরিচয়, যোগাযোগ এবং কক্সবাজারে তাঁদের একসঙ্গে অবস্থানের তথ্য যাচাই করতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার কারণ এবং এ সময় কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা স্পষ্ট করেননি সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১১ অক্টোবর) রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকা থেকে রাজুকে আটক করা হয়। কক্সবাজার সদর মডেল থানা-পুলিশের আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাজমীন হত্যা মামলার ঘটনায় গণমাধ্যমে রাজুর নাম আসার পর স্থানীয় লোকজন তাঁকে আটক করে রাখেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা বা এজাহার ছিল না। তবে ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে আমলযোগ্য অপরাধ সংঘটনের আশঙ্কা থাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে মামলা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এরপর সোমবার সকালে তাজমীন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই পবিত্র সরকার কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর একটি অধিযাচনপত্র দেন। এতে রাজুকে গ্রেপ্তার করে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
অধিযাচনপত্রে উল্লেখ করা হয়, তাজমীনের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার আনুমানিক দুই দিন আগে কক্সবাজার সদর থানা এলাকায় তাঁর অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই সময় রাজুর সঙ্গে তাঁর দেখা-সাক্ষাৎ এবং ঘটনার আগে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া যায়।
তাজমীনের সঙ্গে রাজুর পূর্বপরিচয় ও সম্পর্কের ধরন, তাঁদের যোগাযোগের কারণ, ডিজিটাল মাধ্যমে কথাবার্তা এবং হত্যা মামলার বিষয়ে রাজুর কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য রয়েছে কি না, তা জানতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে অধিযাচনপত্রে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা ডিবির একটি দল কক্সবাজারে গিয়ে রাজুকে নিয়ে তদন্তের বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে। প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁকে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ডিউটি অফিসারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। এরপর ডিবির দলটি সেখান থেকে চলে যায়।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাজুকে কেন ফেরত দেওয়া হলো, তাঁর কাছ থেকে কী তথ্য পাওয়া গেছে এবং তদন্তে নতুন কোনো সূত্র মিলেছে কি না—এসব বিষয়ে জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তা পবিত্র সরকারের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, কুমিল্লার পুলিশ রাজুকে নিতে যায়নি। তাঁকে কয়েকটি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল। হোটেল-সংক্রান্ত কিছু বিষয়েও তদন্তের প্রয়োজন ছিল। সেসব যাচাই করে তাঁকে আবার কক্সবাজার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাজমীনের বাবা-মা রাজুর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে দিতে পারবেন।
অন্যদিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, অধিযাচনপত্র অনুযায়ী রাজুকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু কুমিল্লা ডিবির সদস্যরা তাঁকে আবার ফেরত দেওয়ায় পরে কক্সবাজার সদর মডেল থানা-পুলিশ তাঁকে আদালতে সোপর্দ করেছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে জান্নাতুন তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তদন্তের অংশ হিসেবে রাজুর সঙ্গে তাজমীনের যোগাযোগ ও তাঁদের কক্সবাজারে অবস্থানের তথ্য যাচাই করছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ।
জ/শা