গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন না থাকলেও কয়েকটি মন্দিরের নামে সরকারি চাল বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও পূজা না হলেও দায়িত্ব পালন করছেন ছয়জন করে আনসার সদস্য। আবার জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করেও সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কোনো কোনো মণ্ডপের সভাপতি। এমনকি সাত বছর আগে সভাপতির দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া ব্যক্তির নামও রয়েছে বরাদ্দের তালিকায়।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উপজেলার একাধিক মন্দিরে এ বছর শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন না হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব মন্দিরের কয়েকটির নামে সরকারি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, কিছু মন্দিরের নামে বরাদ্দ করা চাল উত্তোলনও করা হয়েছে।
উপজেলার পূর্ব তারাশী পান্ডেবাড়ি সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপের সভাপতি সত্য পান্ডে জানান, এ বছর জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপন করলেও তাঁদের মণ্ডপের জন্য সরকারি বরাদ্দ মেলেনি।
অন্যদিকে, কোটালীপাড়া পৌরসভার শুভঙ্কর দত্তের বাড়ি সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে এবার পূজার আয়োজন না থাকলেও সরকারি বরাদ্দের তালিকায় নাম রয়েছে মন্দিরটির।
মন্দিরটির সভাপতি শুভঙ্কর দত্ত বলেন, “আমার বাড়ির মণ্ডপে এ বছর দুর্গাপূজা হচ্ছে না। অথচ জানতে পেরেছি, মন্দিরের নামে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আমি বরাদ্দের চাল উত্তোলন করিনি।”
এ ছাড়া কলাবাড়ী, সাদুল্লাপুর ও বান্ধাবাড়ী ইউনিয়নসহ পৌর এলাকার একাধিক মণ্ডপে এ বছর দুর্গাপূজার আয়োজন না থাকলেও সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে আনসার সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উপজেলার কলাবাড়ী ইউনিয়নের মধুবাড়ি সার্বজনীন দুর্গামণ্ডপে গিয়ে পূজার কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। অথচ সেখানে ছয়জন আনসার সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনসার দলের টিম লিডার কমলেশ রায় বলেন, “সরকারিভাবে আমাদের এখানে ডিউটি দেওয়ায় আমরা দায়িত্ব পালন করছি। এখানে পূজা না হলে আমাদের করার কিছু নেই।”
উপজেলা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা সোহেল রানা জানান, পূজামণ্ডপে আনসার সদস্য মোতায়েনের জন্য থানা থেকে তালিকা দেওয়া হয়েছিল। সেই তালিকা অনুযায়ী আনসার সদস্য পাঠানো হয়েছে।
সরকারি বরাদ্দের তালিকায় মন্দিরের সভাপতির পরিচয় নিয়েও অসংগতি পাওয়া গেছে। কালীগঞ্জ বাজার সার্বজনীন দুর্গাপূজা মন্দিরের সভাপতি হিসেবে তালিকায় রয়েছে শরৎ চন্দ্র বালার নাম। তবে তিনি সাত বছর আগেই সভাপতির দায়িত্ব ছেড়েছেন বলে জানিয়েছেন।
শরৎ চন্দ্র বালা বলেন, “আমি সাত বছর আগে ওই মন্দিরের সভাপতি ছিলাম। এখনো সভাপতি হিসেবে তালিকায় আমার নাম কেন দেওয়া হয়েছে, তা জানা নেই।”
পূর্ব বান্ধাবাড়ী ঠাকুরবাড়ি সার্বজনীন মন্দিরের সভাপতি হিসেবেও বরাদ্দের তালিকায় রয়েছে দুলাল কৃষ্ণের নাম। স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, ওই মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা হয় না; তবে চৈত্র মাসে বাসন্তী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
তাঁরা জানান, গত বছরও মন্দিরটির নাম বরাদ্দের তালিকায় ছিল, কিন্তু বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়নি। সে সময় আনসার সদস্য পাঠানো হলেও তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মন্দিরটির নাম বরাদ্দের তালিকায় থাকার কারণ সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
অন্যদিকে, লাখিরপাড় পশ্চিমকান্দি সার্বজনীন দুর্গামন্দিরের সভাপতি চিত্তরঞ্জন মণ্ডল জানান, পূজার ব্যস্ততার কারণে এবারও নির্ধারিত সময়ে সরকারি বরাদ্দের চাল উত্তোলন করা হয়নি। তাঁদের দাবি, প্রতিবছরই পূজা শেষে বরাদ্দের চাল উত্তোলন করেন তাঁরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আনসার আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা থেকে মোট ৩১৫টি মন্দিরের নাম দুর্গাপূজার অনুদানের জন্য পাঠানো হয়েছিল। পূজার আগে সোমবার (১৯ অক্টোবর) শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত ২৯টি মণ্ডপের পক্ষ থেকে বরাদ্দের চাল সংগ্রহ করতে কেউ আসেননি।
তিনি জানান, ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে মন্দিরগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে বরাদ্দের জন্য জেলা পরিষদ কার্যালয়ে পাঠানো হয়। ওই তালিকার ভিত্তিতেই বরাদ্দের চাহিদা পাঠানো ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
আনসার আলী আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে আরও আটটি মন্দিরের তালিকা পাওয়া যায়। সেগুলোর জন্যও বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। তবে ওই মন্দিরগুলোর বিপরীতে চাল বরাদ্দ না হলেও অনুদান হিসেবে কিছু টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে। তিনি এসব অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইফ-উল-আরেফিন বলেন, “সরকারি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শারদীয় দুর্গাপূজার জন্য। আনসার সদস্যও মোতায়েন করা হয় পূজা উপলক্ষে। কোথাও কোনো অনিয়ম হলে খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জ/উ