অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে বিতর্কের মুখে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেও মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার প্রত্যয় জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। তিনি বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান কেবল শুরু হয়েছে, এটি চলবে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর ২টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সামনে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন তিনি।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইন-সংলগ্ন এলাকায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন ইশরাক হোসেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন মহলে সমালোচনা শুরু হয়। পরে রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই নির্দেশনার পর সোমবার সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন ইশরাক।
সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, তিনি যে এলাকায় অভিযান চালিয়েছিলেন, সেটি মাদক বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই চক্রের সদস্যদের কাছে অর্থ ও অস্ত্র রয়েছে।
আলোচিত অস্ত্রটির বিষয়ে তিনি বলেন, অস্ত্রটি বৈধ এবং আত্মরক্ষার প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য হাতে নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ওই এলাকায় পুলিশ যেতে চায় না।
অভিযান নিয়ে বিতর্কের জন্য গণমাধ্যমের একাংশকে দায়ী করে ইশরাক বলেন, ‘সেখানে আমি জমি দখল বা চাঁদাবাজি করতে যাইনি। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম। মিডিয়া সেই অবজেক্টিভ ধ্বংস করেছে।’
তিনি আরও বলেন, মাদক নির্মূলের উদ্দেশ্য থেকে সবার দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের নিরাপত্তার জন্য বৈধ অস্ত্রটি হাতে রেখেছিলেন উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন মহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে প্রচার করা হয়েছে।
অভিযানের সময়কার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ইশরাক বলেন, সেদিন সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশকে অভিযানের বিষয়ে জানিয়েছিলেন এবং কখন তাঁরা আসবেন, সেটিও জানানো হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, এলাকায় প্রবেশের পর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনকে ছোটাছুটি করতে দেখেন এবং একদল লোক তাঁদের দিকে এগিয়ে আসে। তখন নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে অস্ত্রটি হাতে রাখেন, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে আত্মরক্ষা করতে পারেন।
ইশরাকের অভিযোগ, কিছু গণমাধ্যম ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে এমন বয়ান তৈরি করেছে, যাতে মূল ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়েছে। এতে তাঁর ব্যক্তিগত ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ কারণে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়ে নিজেই পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে জানান।
পদত্যাগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আজকের দিন হতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি সেই সুযোগ দিয়েছেন। আজকে যখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করি, সেখানে তাঁকে বলেছি, “আমি পদত্যাগ করতে চাই। কারণ, আমার মাদকবিরোধী অভিযান কেবল শুরু হলো, এটা চলবে। আমার কারণে যেন আপনার এবং সরকারের কর্মকাণ্ড ম্লান না হয়।”’
গেন্ডারিয়ার ঘণ্টিঘর এলাকায় অভিযানের উদ্দেশ্য তুলে ধরে ইশরাক বলেন, মাদক নির্মূলই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য। তবে গণমাধ্যমের একটি অংশ অস্ত্র হাতে তাঁর উপস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমের উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধটা তো মাদকের বিরুদ্ধে। এখানে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই, দলীয় কোনো স্বার্থ নেই, রাজনৈতিক কোনো স্বার্থ নেই।’
ইশরাকের দাবি, ঘণ্টিঘর এলাকায় শুধু মাদক সেবন নয়, মাদক সরবরাহেরও একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফজলুল হক মহিলা কলেজ, গেন্ডারিয়া কলেজ ও মনিজা রহমান কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক সরবরাহ করা হয় বলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁকে জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মাদকের মূল সরবরাহকারীদের শনাক্ত না করলে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন ইশরাক। তাঁর মতে, শুধু রাস্তার পর্যায়ের বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে স্থায়ী সমাধান আসবে না। এ জন্য মাদকের মূল সরবরাহকারী ও নেটওয়ার্কের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে সবার সহযোগিতা চান তিনি।
ইশরাক বলেন, মাদকবিরোধী লড়াই দীর্ঘমেয়াদি এবং এ লড়াই চালিয়ে যেতে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ঢাকা-৬ আসন ও আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূলের পাশাপাশি জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
জ/শা