হুতির হামলায় অস্থির সৌদি, একের পর এক ভুলের খেসারত দিচ্ছে রিয়াদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

2026-10-12T16:20:13+06:00
2026-10-12T16:20:13+06:00
মঙ্গলবার ● ১৩ অক্টোবর ২০২৬,
২৮ আশ্বিন ১৪৩৩
Advertisement
আন্তর্জাতিক
হুতির হামলায় অস্থির সৌদি, একের পর এক ভুলের খেসারত দিচ্ছে রিয়াদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
⏲ ৪:২০ পিএম | ১২ অক্টোবর, ২০২৬ | সোমবার
ছবি- এআই নির্মিত
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার পর পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার চাপে পড়েছে রিয়াদ। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী এই হামলার পর পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে স্থলযুদ্ধে জড়ানো, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক সহায়তা চাওয়া কিংবা আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহযোগিতায় হুতিদের মোকাবিলা-প্রতিটি পথেই রয়েছে বড় ধরনের ঝুঁকি।

গত সপ্তাহে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তা করতে হুতিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি আরব। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিদ্রোহীরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। উল্টো সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা আরও জোরদার করেছে তারা। গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে ইরানের অনুসৃত কৌশল থেকে শিক্ষা নিয়ে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা বাড়ানোর হুমকি দিয়েছে হুতিরা। তাদের লক্ষ্য শুধু সৌদি আরবকে সামরিকভাবে চাপে রাখা নয়, বরং এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে দেওয়া।

সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে রিয়াদের এক দশকব্যাপী যুদ্ধ ইয়েমেনে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। তবে সাম্প্রতিক হামলাকে অনেকেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের বিস্তৃত অংশ হিসেবে দেখছেন।

স্থলযুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি
গত ১১ বছর ধরে সামরিক অভিযান ও আলোচনার মাধ্যমে হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানোর চেষ্টা করেছে সৌদি আরব। কিন্তু এতে বিদ্রোহীদের শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হয়নি। বরং ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করেছে তারা। ঘনবসতিপূর্ণ তাইজের মতো এলাকাও দখলের চেষ্টা করছে হুতিরা।

সৌদি রাজনীতি বিষয়ে লেখক ও বিশ্লেষক আলী শিহাবি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, ‘এই হুমকির স্থায়ী সমাধান করতে হবে।’

তার মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার ওপর পরিস্থিতির অনেক কিছু নির্ভর করবে। সৌদি আরব আকাশপথে দেশটির সরকারি বাহিনীকে ব্যাপক সহায়তা দিচ্ছে।

এখন পর্যন্ত সৌদি আরব মূলত হুতিবিরোধী ইয়েমেনি জোটকে বিমান সহায়তা দিয়ে আসছে। তবে নিজস্ব বিপুলসংখ্যক সেনা সরাসরি স্থলযুদ্ধে পাঠানো থেকে বিরত থেকেছে দেশটি। রিয়াদে সর্বশেষ হামলার পর সেই সংযম বজায় রাখা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ইয়েমেনে বড় আকারে সৌদি সেনা মোতায়েন করা হলে দুর্গম ভূখণ্ডে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে দেশটি। একই সঙ্গে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের গড়ে তোলা স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়েছে হুতিরা
প্রায় দুই দশক আগেও হুতিরা ছিল ছোট একটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন। ইরানের সমর্থনে সময়ের সঙ্গে তারা শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাদের হাতে এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলো দিয়ে তেল আবিবের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যেও হামলা চালানো সম্ভব।

বছরের পর বছর হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, বিদ্রোহীরা তাদের যুদ্ধকৌশল উন্নত করেছে। তাদের হামলা আগের তুলনায় আরও অত্যাধুনিক ও ধারাবাহিক হয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে গোয়েন্দা সক্ষমতাও।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নাজিলি অভিযোগ করেন, হুতিরা ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকারিতা বাড়িয়েছে। তার দাবি, নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আরও দ্রুতগতির। পাশাপাশি তাপ শনাক্তকারী ব্যবস্থার সাহায্যে তাপের উৎস অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে এসব ক্ষেপণাস্ত্র। তবে শনিবার রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলায় এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হুতিদের অস্ত্র উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনে অবস্থিত একটি গোষ্ঠী তাদের ক্লড এআই প্রযুক্তির সহায়তায় রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা সফটওয়্যার তৈরির কাজে সহায়তা নিয়েছে। উড্ডয়নের সময় অস্ত্রের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে এ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়।

অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে ওই এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় গোষ্ঠীটির সঙ্গে তাদের সম্ভাব্য যোগসূত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে রিয়াদ
হুতিদের মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের সমর্থন চেয়েছে সৌদি আরব। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তুরস্কের মতো অন্য মিত্ররাও সহযোগিতার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সিরিয়ার সহায়তাও চেয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রায় এক দশকের গৃহযুদ্ধের পর দেশটি থেকে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

তবে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলায় অংশ নেয়নি। এর পরিবর্তে নতুন গঠিত যৌথ কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা সহায়তা দিতে ১০০ জনের বেশি সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছে ওয়াশিংটন।

গত বছর ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি মার্কিন জাহাজ চলাচলের জন্য আবার খুলে দেওয়া হয়।

গত মাসে সৌদি যুবরাজ দুবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলে হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে সে সময় সিএনএনকে জানিয়েছিল কয়েকটি সূত্র। তবে ট্রাম্প তাতে সম্মত হননি।

আলী শিহাবির মতে, মার্কিন বিমানবাহিনী সরাসরি অভিযানে অংশ নিলে সৌদি আরব সুবিধা পেত। কারণ, মার্কিন বিমানবাহিনী দ্রুত স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালাতে পারে। সৌদি বিমানবাহিনীকে একই প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত একটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।

মার্কিন নাগরিক নিহত, ট্রাম্পের ইঙ্গিত
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কিনলেও সৌদি আরব এখনো নিরাপত্তাঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশাল মরুভূমিজুড়ে বিস্তৃত দেশটির জ্বালানি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তুলনামূলক কম খরচে তৈরি হুতিদের একমুখী ড্রোনের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ রোববার জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও রয়েছেন। এই ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনকে সংঘাতে আরও সরাসরি যুক্ত হওয়ার চাপের মুখে ফেলতে পারে।

হামলার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ‘সৌদিরা ভালো যোদ্ধা। তবে আমার মনে হয়, হামলাটি ছিল ভয়াবহ।’

যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় যোগ দেবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যোগ দিতে পারি।’

ট্রাম্পের এই মন্তব্যে সংঘাতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে সৌদি আরবের সামনে এখনো বড় প্রশ্ন-দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধের ঝুঁকি নেবে, নাকি আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে হুতিদের মোকাবিলা করবে। সূত্র: সিএনএন

জ/উ


Advertisement
সর্বশেষ
‹ ›
যোগাযোগ  |   আমাদের পরিচয়  |   গোপনীয়তা নীতিমালা  |   ব্যবহারের শর্তাবলি  |   দায়মুক্তি  |   বিজ্ঞাপন নীতিমালা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: আক্তার হোসেন রিন্টু
© ২০২৬ প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত