স্কটল্যান্ডের এডিনবরার কাছাকাছি শান্ত-নিরিবিলি জীবন কাটাতেন ৫২ বছর বয়সী ক্লেয়ার। প্রশাসনিক চাকরি করতেন তিনি। অবসরে কুকুরের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া ও বেকিং ছিল তাঁর পছন্দ। তিন বছর আগেও নিজেকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় মানুষ মনে করতেন না। তবে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ তাঁর জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-কে সমর্থনের অভিযোগে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের মুখোমুখি তিনি।
আল জাজিরাকে ক্লেয়ার জানান, ২০২৩ সালের গ্রীষ্মে গাজার চিকিৎসক ইজ্জেলদিন আবুয়েশের লেখা আই শ্যাল নট হেট বইটি পড়েন তিনি। ২০০৯ সালে ইসরায়েলি ট্যাংকের গোলাবর্ষণে ওই চিকিৎসকের তিন মেয়ে নিহত হয়েছিলেন। বইটি পড়ার পর ৭ অক্টোবরের হামলা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তিনি অনলাইনে অনুসরণ করতে শুরু করেন।
এরপর ফিলিস্তিনের সমর্থনে একটি সমাবেশে অংশ নেন ক্লেয়ার। তৎকালীন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুয়েলা ব্রেভারম্যান ওই বিক্ষোভকে ‘বিদ্বেষের মিছিল’ হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পর তিনি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। আইনপ্রণেতাদের কাছে চিঠি লেখা, ফিলিস্তিনি ত্রাণ কার্যক্রমের জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শুরু করেন তিনি।
২০২৫ সালের আগস্টে ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-এর ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য আন্দোলনেও যুক্ত হন ক্লেয়ার। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগঠনটির প্রতি সমর্থনের অভিযোগে এ পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ক্লেয়ারের ভাষ্য, জীবনে কখনো কোনো অপরাধে জড়াননি তিনি। এরপরও সন্ত্রাসবাদ আইনের দুটি ধারায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়া এবং অন্যদের ওই সংগঠনে যোগ দিতে উৎসাহিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
ক্লেয়ার বলেন, ‘আমি পিছু হটছি না।’
ক্লেয়ারের মতো ৭০ বছর বয়সী মার্জিও এর আগে কখনো কোনো বিক্ষোভে অংশ নেননি। তবে ২০২৩ সালের আর্মিস্টিস ডেতে ‘এখনই যুদ্ধবিরতি’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামেন তিনি।
মার্জির বাবা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। তাঁর শ্বশুরও রয়্যাল এয়ার ফোর্সে কাজ করেছেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানে যুদ্ধবন্দি ছিলেন।
আর্থিক খাতে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অবসর নেওয়া মার্জি এখন স্বামীর সঙ্গে নাতি-নাতনিদের নিয়ে সময় কাটান। কিন্তু ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে গত জুলাইয়ে ওয়েস্টমিনস্টারে তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’-কে সমর্থনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এখন তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হবে কি না, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন তারা।
মার্জি জানান, পুলিশ বাড়িতে আসতে পারে-এমন পরিস্থিতিতে নাতি-নাতনিদের কাছে রাখা নিরাপদ হবে কি না, সেটিও তাঁদের ভাবতে হচ্ছে। তবে তাঁদের সন্তানরা বাবা-মায়ের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছেন।
ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ব্রিটেনে শিল্পী, শ্রমিক, রেলকর্মী, আর্থিক খাতের কর্মী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক পেশায় যুক্ত মানুষও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। গত তিন বছরে লাখো মানুষ গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং এতে যুক্তরাজ্যের ভূমিকার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন।
বিক্ষোভকারীদের অনেকে ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ এবং দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
২০২৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ করার পর এ নিয়ে প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়। সংগঠনটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে ‘ডিফেন্ড আওয়ার জুরিস’সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী অহিংস অসহযোগ ও নাগরিক অবাধ্যতার কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ৭ অক্টোবরের হামলার তৃতীয় বার্ষিকী ঘিরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বুধবার লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, উত্তর লন্ডনে ব্রিটিশ ইহুদি সংগঠনগুলোর একটি কার্যালয়ের বাইরে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশের দাবি, তাঁরা ‘ইন্তিফাদা’ আহ্বানকারী স্লোগান দিচ্ছিলেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিসাবে বলা হয়েছে, হামাসের ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৪০ জনের বেশি জিম্মি হন।
এরপর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় উপত্যকার বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
মার্জি বলেন, ছোটবেলায় তাঁরা যে বর্ণনা শুনে বড় হয়েছেন, তা নিয়েও এখন তাঁর মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষায়, যাঁদের শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসকারী মানুষ হিসেবে তাঁদের কাছে তুলে ধরা হয়েছিল, তাঁদেরই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; অথচ তাঁরাই সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন।
ক্লেয়ার ও মার্জি দুজনেরই বিশ্বাস, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডে ব্রিটিশ সরকারের ভূমিকা রয়েছে এবং সরকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
মার্জির মাতামহী ইহুদি ছিলেন। তিনি বলেন, গণহত্যা বন্ধের দাবি তোলা ইহুদিবিদ্বেষ নয়। ইহুদি জনগণ এবং অবৈধ দখলদারিত্বকে সমর্থনকারীদের মধ্যে পার্থক্য করার সক্ষমতা তাঁদের রয়েছে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের অংশগ্রহণে ‘ওয়ার্কার্স ফর ফ্রি প্যালেস্টাইন’ গড়ে ওঠে। সংগঠনটির ভাষ্য, অনেক মানুষ তাঁদের শ্রম কীভাবে ইসরায়েলের পক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে আপত্তি জানালেও ব্যক্তিগতভাবে কিছু করার সুযোগ নেই-এমন ধারণা তাঁদের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে।
তবে ঝুঁকি সত্ত্বেও আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ আশাবাদী। মার্জি বলেন, কিছু না করলে তাঁদের মধ্যে অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ তৈরি হয়। তাঁর আশা, একসময় মানুষ বুঝতে পারবে, ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার কারণে ব্রিটেনেও নাগরিক স্বাধীনতার ওপর চাপ বাড়ছে। সূত্র: আল জাজিরা
জ/উ