একজনের নিথর দেহ পড়ে ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে এসেছিলেন তন্ময়ী মণ্ডল। যে মানুষটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল, যার সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন ছিল- সেই আকাশ মিত্রকে শেষবারের মতো দেখলেন তিনি। কিন্তু সেই শেষ দেখাই যেন হয়ে উঠল তাঁর নিজের জীবনেরও শেষ অধ্যায়। প্রেমিকের মরদেহ দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঢামেক হাসপাতালের একটি টয়লেট থেকে উদ্ধার করা হলো তন্ময়ীর নিথর দেহ।
তন্ময়ী মণ্ডল (২৯) ছিলেন একজন নার্স। তিনি ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে কাজ করতেন। প্রায় এক মাস আগে তিনি সেখানে যোগ দিয়েছিলেন। আর আকাশ মিত্র (৩৬) একটি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁদের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া ও পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায়।
ঘটনার শুরু গত রোববার বিকেলে। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের মালোপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে আকাশ মিত্রের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নেওয়া হয় ঢামেক মর্গে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান তন্ময়ী।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মর্গে আকাশের মরদেহ দেখার পর তন্ময়ী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। হাসপাতালের ভেতরে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করেন তিনি। এরপর কী ঘটেছিল, তারই পরিণতি মেলে পরদিন সকালে।
গত সোমবার সকাল ১০টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের পুরোনো ভবনের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি একটি টয়লেট থেকে তন্ময়ীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা টয়লেটের একটি কক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে সন্দেহ করেন। পরে বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও আনসার সদস্যদের জানান। খবর দেওয়া হয় শাহবাগ থানায়।
তবে তন্ময়ীর মৃত্যুকে ঘিরে শুরুতেই তৈরি হয় নানা প্রশ্ন। হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের কাছাকাছি রক্তের দাগ ও একটি ছুরি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট। তন্ময়ীর ব্যাগ থেকেও একটি চিরকুট পাওয়া যায়, যাতে তাঁর নাম লেখা ছিল। হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় ফুটেজও পর্যালোচনা করছে পুলিশ।
প্রথম দিকে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড কি না, তা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। পরে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য, প্রাথমিক তদন্ত ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ আত্মহত্যার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে চাইছে না পুলিশ।
তন্ময়ীর বোন তন্দ্রা মণ্ডল জানান, কেরানীগঞ্জের আকাশের সঙ্গে তাঁর বোনের সম্পর্ক ছিল। আকাশ বিবাহিত ছিলেন। তন্ময়ী বিষয়টি জানতেন। তবে আকাশ স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তন্ময়ীকে বিয়ে করবেন বলে জানিয়েছিলেন। এ নিয়ে তাঁর সংসারে অশান্তিও চলছিল বলে জানান তন্দ্রা।
তন্দ্রার অভিযোগ, আকাশ বিভিন্ন অজুহাতে তন্ময়ীর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নিয়েছিলেন। ওই টাকা তন্ময়ী অন্যদের কাছ থেকে ধার করে আকাশকে দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, আকাশ তন্ময়ীর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।
অন্যদিকে আকাশের মৃত্যুর পেছনে আর্থিক সংকট ও ঋণের চাপের কথা জানিয়েছে পুলিশ। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই রফিকুল ইসলাম বলেন, আকাশ আর্থিক সংকটে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। মৃত্যুর আগে লেখা একটি চিরকুটে তিনি লিখেছিলেন ‘পৃথিবী ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু টাকা নেই।’ চিরকুটে তন্ময়ী তাঁর কাছে টাকা পাবেন বলেও উল্লেখ ছিল। তবে আকাশের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি সেখানে।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, দুই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে তন্ময়ীর মৃত্যুর বিষয়ে একটি ধারণা পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাবে না।
শাহবাগ থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামানও জানান, ঘটনাটির সব দিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত, চিরকুট এবং পরিবারের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে তদন্ত চলছে।
তন্ময়ীর পরিবারের কাছে এখন প্রশ্নের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে শোক। একজন নার্স হিসেবে মানুষের জীবন বাঁচানোর দায়িত্বে থাকা মেয়েটিই শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের কাছে হেরে গেলেন—আর তাঁর পরিবারকে একই সঙ্গে সামলাতে হচ্ছে প্রিয়জন হারানোর দ্বিগুণ শোক। আকাশের মৃত্যুর পর মর্গে যে শেষ দেখার জন্য তন্ময়ী এসেছিলেন, সেই হাসপাতাল থেকেই শেষ পর্যন্ত তাঁকেও ফিরতে হলো নিথর হয়ে।
জ/বা