জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণে ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক, জ্বালানি ও রাজস্ব খাতে গভীর সংস্কার করতে হবে।
আজ মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের নতুন ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বিনিয়োগ কার্যক্রম বর্তমানে অত্যন্ত মন্থর। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর প্রভাবে সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা ঋণ মধ্যস্থতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সীমিত রাজস্ব সংস্থানের কারণে সরকারের বড় বিনিয়োগ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির কারণে দেশের বহির্বিশ্বমুখী অর্থনৈতিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের গতি বাড়ানো সম্ভব হলে ২০২৮ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত এবং সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আর বিলম্বের সুযোগ নেই; এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়।
বাড়ছে দারিদ্র্য ও খেলাপি ঋণ
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। একই সময়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় থমকে গেছে এবং বিপুলসংখ্যক নারী চাকরি হারিয়েছেন।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও আরও প্রকট হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থাকলেও ২০২৬ সালের জুনে তা বেড়ে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
দেশের রাজস্ব আহরণের চিত্রও দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির মাত্র ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় হয়েছে, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায়ের। এর ফলে প্রয়োজনীয় জনকল্যাণমূলক খাতে সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা সীমিত হচ্ছে। অন্যদিকে ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতি থাকলেও ২০২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
দরিদ্রদের সুরক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার পরামর্শ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কিছুটা সুরক্ষা দিলেও বাস্তবে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র প্রায় অর্ধেক পরিবার কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির মতে, সামাজিক কর্মসূচিগুলোর সুবিধাভোগী নির্বাচনে আরও কার্যকর লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। সরকারের সীমিত সম্পদ যেন প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায়, সে জন্য আরও সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্রিত করা এবং বিদ্যমান নগদ অর্থ সহায়তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনে আরও কার্যকর লক্ষ্য নির্ধারণের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা গেলে অতিরিক্ত ২৮ দশমিক ৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশ হতে পারে
‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ প্রতিবেদনটি বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আঞ্চলিক প্রতিবেদন ‘দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ’-এর পরিপূরক অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নীতিগত অগ্রাধিকারও পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বিভিন্ন বৈশ্বিক ধাক্কার মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে। এর ফলে চলতি বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। তবে প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ২০২৭ সালে এ প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োহানেস জুট বলেন, প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশের মধ্যেও দক্ষিণ এশিয়া উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। তবে এই ইতিবাচক গতি ধরে রাখতে এবং যুবসমাজের জন্য আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে অঞ্চলটির প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দ্রুত বর্ধনশীল এআই-নির্ভর বৈশ্বিক ভ্যালু চেইন থেকে তৈরি হওয়া নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে দেশগুলোর দক্ষতা, অবকাঠামো ও সহায়ক কর্মপরিবেশে বিনিয়োগ করা উচিত। এর মাধ্যমে কর্মী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে।
প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস হতে পারে এআই
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস তৈরি করতে পারে, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় এআইয়ের ব্যবহার ও প্রয়োগ ক্রমেই বাড়ছে। যদিও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এ ক্ষেত্রে অঞ্চলটি এখনো পিছিয়ে রয়েছে, তারপরও প্রযুক্তিটির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন বাজারের সুযোগ খুঁজতে এআই ব্যবহার শুরু করেছে।
শুধু বেসরকারি খাত নয়, বিভিন্ন দেশের সরকারও কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং জনসেবার মান উন্নত করতে এআই কাজে লাগাচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে ভারতে ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে এআইভিত্তিক নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া এবং বাংলাদেশে এআইয়ের সহায়তায় উন্নত রেটিনাল স্ক্রিনিংয়ের মতো জনসেবামূলক উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসোর্গে বলেন, এআই গ্রহণের মাধ্যমে শ্রম উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, রপ্তানির বৈচিত্র্য ও সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জনসেবার মান উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নের গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে এআইয়ের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে প্রযুক্তি গ্রহণের পথে থাকা মৌলিক ও অবকাঠামোগত ঘাটতিগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে দূর করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জ/উ