একদিন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার ফোন ধরতে পারেননি জিনিয়া জাফরিন লুইপা। পরে খুদে বার্তায় প্রেরকের নাম দেখে অবাক হন তিনি। ফিরতি ফোন করতেই পান উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। গানচিল মিউজিক থেকে তাঁর কণ্ঠে বেগম আখতারের গাওয়া ‘জোছনা করেছে আড়ি’ প্রকাশের পরই ঘটেছিল এ ঘটনা। রুনা লায়লার সেই প্রশংসা এখনো লুইপার কাছে বিশেষ প্রাপ্তি।
রুনা লায়লার সঙ্গে লুইপার পথচলার শুরু আরও আগে। ২০১০ সালে ‘চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ’ প্রতিযোগিতায় দেবদাস ছবির ‘পায়েরই নূপুর আমার জাদু জানে’ গানটি গেয়েছিলেন তিনি। এরপর রুনা লায়লার সুরে গান গাওয়ার সুযোগও পান। গত বছর ‘চুড়ি ছাম ছাম’ প্রকাশের পর আবারও রুনা লায়লার প্রশংসা ও আশীর্বাদ পেয়েছেন লুইপা।
এবারও রুনা লায়লার জন্মদিন ১৭ নভেম্বর উপলক্ষে নতুন গান প্রকাশের ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে দুই মাসের সফরে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন লুইপা। সঙ্গে রয়েছে তাঁর নিজের দল ‘লুইপা এন উইংস’। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে দেশে ফেরার কথা রয়েছে তাঁর। মঞ্চে গান গাওয়ার পাশাপাশি সফরের মধ্যেই নতুন গান প্রকাশের পরিকল্পনা করছেন তিনি।
লুইপা বলেন, ‘হাতে নতুন গান তিন-চারটা আছে। আপাতত একটি গান প্রকাশ করব। তবে কোনটা করব, সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। চেষ্টা করব রুনা ম্যামের জন্মদিনে একটি গান প্রকাশের। এবার ১৫ থেকে ১৭ নভেম্বরের মধ্যে দেওয়ার চেষ্টা করব।’
গত বছর রুনা লায়লার জন্মদিনেই ‘চুড়ি ছাম ছাম’ প্রকাশ করেছিলেন লুইপা। গানটি সামাজিক মাধ্যমে সাড়া ফেলেছিল। লুইপার কথায়, ‘প্রতিবছরই রুনা লায়লা ম্যামের জন্মদিনে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। দিনটা আমার কাছে খুব বিশেষ।’
গানটি এতটা সাড়া পাবে, তা অবশ্য ভাবেননি লুইপা। তাঁর মতে, ভিডিওতে রুকাইয়া জাহান চমকের উপস্থিতি ও পরিবেশনা গানটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
এর আগে রুনা লায়লার সুরে ‘এই দেখা শেষ দেখা’ গানটি গেয়েছেন লুইপা। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা গানটি প্রকাশ করে ধ্রুব মিউজিক স্টেশন। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লুইপা বলেন, ‘আমার অনেক সৌভাগ্য যে তাঁর সুর করা গান গেয়েছি। তাঁর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা অনেক বড় বিষয়।’
‘চুড়ি ছাম ছাম’ প্রকাশের পর লুইপার জন্য আরও একটি গানে সুর করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন রুনা লায়লা। তবে এ নিয়ে এখনো বসা হয়নি। আবার দেখা হলে কাজটি এগিয়ে নেওয়ার আশা করছেন লুইপা।
‘চুড়ি ছাম ছাম’-এর পর লুইপার কণ্ঠে এসেছে ‘ও আমার জানু’। সর্বশেষ ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয়েছে ‘প্রজাপতি’। গানটির ভিডিওতে লুইপার সঙ্গে দেখা গেছে তাঁর মেয়ে পায়রাকে। সন্তানকে ঘিরে মা-বাবার মুগ্ধতার গল্পই জড়িয়ে আছে গানটির সঙ্গে।
গীতিকার রবিউল ইসলাম জীবন মেয়েকে নিয়ে গ্রামে গিয়েছিলেন। সেখানে প্রজাপতি দেখে মেয়ের মুগ্ধতা থেকেই গানটি লেখার ভাবনা আসে। গল্পটি শুনে লুইপার মনে হয়, নিজের মেয়ের শৈশবও একটি গানের মধ্যে ধরে রাখা যায়।
লুইপা বলেন, ‘সামনে আমার মেয়েরও জন্মদিন। ওর বয়স বাড়ছে, একদিন বড় হয়ে যাবে। এখনকার এই সময়টাকে বন্দী করে রাখার জন্যই গানটা করা।’
‘প্রজাপতি’র সুর ও সংগীত করেছেন দৃপ্ত। জীবন ও দৃপ্তের সঙ্গে এর আগে ‘প্রিন্স’ ছবির ‘রঙিন ফাগুন’ গানে কাজ করেছিলেন লুইপা। সেখানে তাঁর গাওয়া অংশটুকু ছিল ছোট। পরে আরেকটি মেলোডিনির্ভর গান করার ইচ্ছা থেকেই তৈরি হয় ‘প্রজাপতি’।
লুইপার দল ‘লুইপা এন উইংস’ পরিচালনা করেন তাঁর স্বামী ও যন্ত্রশিল্পী আলমগীর হোসেন। তিনি অক্টোপ্যাড বাজানোর পাশাপাশি দলের সংগীত আয়োজনের বিষয়টিও দেখভাল করেন। মঞ্চে এই দল নিয়েই গান করেন লুইপা।
নিজের দল নিয়ে কেন পরিবেশনা করেন-এ প্রসঙ্গে লুইপা জানান, মঞ্চে দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী নানা ধরনের গান গাইতে হয়। পুরোনো জনপ্রিয় গান পরিবেশনের কারণে বয়স্ক শ্রোতাদের একটি অংশ তাঁর গান পছন্দ করেন। আবার স্কুলের অনুষ্ঠান কিংবা ঢাকার বাইরের কনসার্টে দ্রুতলয়ের গান, নতুন গান ও লোকগানের চাহিদা থাকে। পরিচিত একটি দল সঙ্গে থাকলে এই বৈচিত্র্য ধরে রাখা সহজ হয়।
নিজের ইউটিউব চ্যানেলে গান প্রকাশের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগীত প্রতিষ্ঠানেও কাজ করছেন লুইপা। সম্প্রতি এফটিউন থেকে প্রকাশিত হয়েছে ‘মন নিল সে’। আরটিভি মিউজিক স্টেশন ও গানবাংলার ‘উইন্ড অব চেঞ্জ’-এও গান গেয়েছেন তিনি।
নতুন কাজের ক্ষেত্রে ভালো পৃষ্ঠপোষকতাকে গুরুত্ব দেন লুইপা। ‘এই দেখা শেষ দেখা’ গানটির উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, গানটির সংগীত আয়োজনসহ পুরো ব্যয় বহন করেছিলেন ধ্রুব গুহ। এ জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ লুইপা।
‘পরাণ’ ছবিতে প্লেব্যাকও করেছেন তিনি। চলচ্চিত্রে খুব বেশি গান গাওয়ার সুযোগ না হলেও যেসব কাজ করেছেন, সেগুলোর প্রশংসা পেয়েছেন বলে জানান লুইপা। সামনে ভালো গানে প্লেব্যাক করার আশা রয়েছে তাঁর।
পাশাপাশি নজরুলসংগীত নিয়েও আরও কাজ করতে চান লুইপা। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের গান গেয়ে আসছেন তিনি এবং জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারও পেয়েছেন। ‘উইন্ড অব চেঞ্জ’-এ তাঁর গাওয়া তিনটি গানের মধ্যে দুটি ছিল নজরুলসংগীত।
লুইপা বলেন, ‘সেখানকার মতো সংগীত আয়োজন হয়তো করা যাবে না। তবে নজরুলের আরও গান নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে।’
বগুড়ায় বেড়ে ওঠা লুইপা মাত্র তিন বছর বয়সেই একটি পুরো গান মুখস্থ করে গেয়ে শুনিয়েছিলেন। তাঁর মা-বাবা গানের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও মেয়ের আগ্রহ দেখে তাঁকে শিশু একাডেমিতে ভর্তি করে দেন। সেখানে গান ছাড়াও নাচ, আবৃত্তি ও অভিনয় শেখেন তিনি। পরে ওস্তাদ বেলাল হোসেনের কাছে গানের তালিম নেন। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জন করেন ১৪টি স্বর্ণপদক।
২০১০ সালে ‘চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠ’ প্রতিযোগিতা তাঁকে বড় পরিসরের শ্রোতার সামনে নিয়ে আসে। পরে প্রকাশিত হয় তাঁর একক অ্যালবাম ‘ছায়াবাজি’। এই অ্যালবামের ‘জেন্টলম্যান’ গানটি তাঁর পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
ছোটবেলার অভিনয়ের আগ্রহ থেকে আতিকুল হক চৌধুরীর ‘বৃষ্টি বালিকা’ ও গিয়াস উদ্দিন সেলিমের ‘পালিয়ে বিয়ে’ নাটকেও অভিনয় করেছেন লুইপা। তবে এখন আর অভিনয়ে ফেরার পরিকল্পনা নেই তাঁর।
লুইপা বলেন, ‘ছোটবেলায় গান, নাচ, আবৃত্তি, অভিনয়-সবই করতাম। এখন শুধু গানই করি। মিউজিক ভিডিওতে যতটুকু উপস্থিত থাকতে হয়, সেটুকুই।’
জ/উ